বাংলাদেশে সোনা চোরাচালান রোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও পাচার থেমে নেই। বিমানবন্দর ও সীমান্ত এলাকায় নিয়মিতভাবে ধরা পড়ছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সোনা। তবে চোরাচালানের প্রকৃত পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের ১১ ফেব্রুয়ারি হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৩ কেজি ২৮৯ গ্রাম সোনাসহ এক যাত্রীকে আটক করে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। অন্যদিকে, ২৭ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদার হুদাপাড়ার একটি পরিত্যক্ত গোয়ালঘর থেকে ২ কেজি ৩৩৫ গ্রাম সোনা জব্দ করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। দুই ঘটনায় উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ ৫ কেজি ৬২৪ গ্রাম, যার বাজারমূল্য ৭৭ কোটি টাকার বেশি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগস্টে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সোনা চোরাচালানিদের পৃষ্ঠপোষক বদলালেও চোরাচালান বন্ধ হয়নি। বরং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং সীমান্তে নজরদারির দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে অপরাধীরা সক্রিয় থাকছে। বিজিবি ও শুল্ক গোয়েন্দার হিসাব অনুযায়ী, গত সাত মাসে (আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি) ১৪৩ কেজি অবৈধ সোনা জব্দ করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য প্রায় ১৯৬ কোটি টাকা।
বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এস এম শফিকুর রহমান জানিয়েছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়া সোনা চোরাচালান প্রতিরোধ করা অত্যন্ত কঠিন। অনেক সময় বাহকরা অভিযানের খবর পেয়ে সোনা ফেলে পালিয়ে যায়, ফলে বাহককেও ধরা সম্ভব হয় না। সীমান্তে একটি বিওপি থেকে অন্যটির দূরত্ব ৫ থেকে ৭ কিলোমিটার। প্রতিটি বিওপিতে দায়িত্বে থাকা ২০-৩০ জন সদস্যের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ক্যাম্প সুরক্ষায় থাকেন, ফলে টহলের সুযোগ সীমিত থাকে। এ কারণে নির্ভর করতে হয় নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্যের ওপর।
সোনা চোরাচালান নতুন কোনো ঘটনা নয়। বহুদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্য থেকে বাংলাদেশ হয়ে ভারতে সোনা পাচার হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাংলাদেশকে এই রুটে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতের সোনার বিশাল বাজারই চোরাচালানকে টিকিয়ে রেখেছে। ২০২৩ সালের ২৩ এপ্রিল ভারতের ‘ইকোনমিক টাইমস’–এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতে বছরে আট লাখ কেজি সোনার চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রতি বছর ৮০ থেকে ৯০ হাজার কেজি সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে প্রবেশ করে। এই চোরাচালানে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, এই দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তায় দুর্বলতা রয়েছে। ভারতে সোনা আমদানির ওপর উচ্চ হারে শুল্ক থাকায় চোরাপথে সোনা আনাই ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক। প্রতি কেজি সোনায় চোরাচালানকারীদের লাভ দাঁড়ায় ৮ থেকে ৯ লাখ রুপি বা ১১ থেকে ১৩ লাখ টাকা।
গত পাঁচ বছরে বিজিবি দেশের বিভিন্ন সীমান্ত থেকে ৭২৫ কেজি সোনা উদ্ধার করেছে। একই সময়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে জব্দ করেছে ৮৪০ কেজি সোনা। শুধু হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকেই গত দুই বছরে ঢাকা কাস্টমস হাউস উদ্ধার করেছে ৪৩৬ কেজি সোনা। সর্বশেষ দুই বছরে তিনটি সংস্থা মিলে ১ হাজার ১৬৪ কেজি সোনা জব্দ করেছে, যা বছরে গড়ে ৫৮২ কেজি। তবে এসবের বাইরেও কাস্টমস কর্তৃপক্ষ স্থলবন্দর ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সোনা উদ্ধার করে যার নির্ভরযোগ্য হিসাব পাওয়া যায়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্র বলছে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে দুইভাবে সোনা পাচার করা হয়। এক, বৈধ যাত্রাপথে ঘোষণা ছাড়াই বা মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে সোনা বহন। দুই, অবৈধ সীমান্তপথে পাচার। গত ৫ আগস্টের পর ভারত বাংলাদেশিদের ভিসা দেওয়া কমিয়ে দেয়ায় সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সোনা পাচার বেড়েছে। চোরাকারবারিরা সীমান্ত অঞ্চলের ৮টি জেলার অন্তত ৯০টি পথ ব্যবহার করছেন, যার মধ্যে যশোর, সাতক্ষীরা, চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহে রয়েছে অন্তত ৫০টি সক্রিয় রুট।
শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, দেশের পাশাপাশি ভারতের বাজারেও সোনার চাহিদা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ভারতে আসা মাদকের অর্থ পরিশোধেও সোনা ব্যবহৃত হয়। এভাবে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা সোনা বাংলাদেশ হয়ে ভারতে পাচার হয়।
চুয়াডাঙ্গার দামুড়হুদা থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা সোনার মালিকানা এখনো শনাক্ত হয়নি। এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তার করা যায়নি। অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা হলেও তদন্তে অগ্রগতি নেই। দামুড়হুদা থানার ওসি মো. হুমায়ুন কবির জানান, এখনো কাউকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
চোরাচালানের ঘটনাগুলোতে সাধারণত সোনার বাহক ধরা পড়লেও মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থ লগ্নিকারী বা আশ্রয়দাতারা থেকে যান ধরা ছোঁয়ার বাইরে। যেমন ২৮ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা সদর এলাকায় যাত্রীবাহী বাস থেকে ১৮টি সোনার বারসহ দুই বাহককে গ্রেপ্তার করে বিজিবি। তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখনো চক্রের কারও পরিচয় পাওয়া যায়নি। ওসি মো. খালেদুর রহমান জানান, গ্রেপ্তারকৃতরা কেবল বাহক, যারা জানেই না মালিক কে।
যশোর, ঝিনাইদহ ও সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় গত আগস্টের পর হওয়া আটটি মামলার ক্ষেত্রেও চোরাকারবারি চক্রের কাউকে শনাক্ত করা যায়নি। বিজিবি এসব মামলার বাদী হলেও তদন্তের দায়িত্ব পুলিশের। বিজিবির পরিচালক (অপারেশন) এস এম শফিকুর রহমান বলেন, বাহিনীর মূল দায়িত্ব সোনা জব্দ ও মামলা দায়ের তদন্তে তারা জড়িত না থাকায় বিস্তারিত বিশ্লেষণের সুযোগও সীমিত।
ঢাকা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ৩ ডিসেম্বর ৭ কেজি সোনাসহ চারজনকে আটক করে ঢাকা কাস্টমস হাউস। তাদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে কিন্তু এখনও বাহক ছাড়া অন্য কেউ ধরা পড়েনি। বিমানবন্দর থানার ওসি তাসলিমা আক্তার জানান, বাহকেরা সাধারণত কিছুই জানেন না। ফলে তদন্তে চক্রের মূলে পৌঁছানো যায় না।
এই প্রেক্ষাপটে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সৈয়দ মুসফিকুর রহমান বলেন, সোনা চোরাচালান মামলাগুলোকে আরও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা দরকার।
চোরাচালানকে কেন্দ্র করে অপরাধের ঘটনাও ঘটছে। গত বছরের ১৩ মে ভারতের কলকাতায় নিহত হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের তৎকালীন সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম। ধারণা করা হয়, আন্তঃদেশীয় সোনা চোরাচালান চক্রের দ্বন্দ্ব থেকেই এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। চোরাচালান চক্র মাদক পাচারের অর্থ পরিশোধে সোনা ব্যবহার করে থাকে বলেও গোয়েন্দা সূত্রের ধারণা।
অর্থনৈতিকভাবে সোনা চোরাচালান ভয়াবহ ক্ষতির কারণ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, অবৈধ বাণিজ্যে সোনা ব্যবহৃত হচ্ছে যার ফলে সরকারের রাজস্ব আয় কমছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার মজুতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তিনি বলেন, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে বড় অঙ্কের অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য রয়েছে, যা যদি বৈধ হতো, তবে সরকার রাজস্ব আদায়ে আরও সক্ষম হতো।
এই চোরাচালান বন্ধে কেবল বাহকদের গ্রেপ্তারে সীমাবদ্ধ না থেকে গোড়ায় পৌঁছাতে হবে, শনাক্ত করতে হবে চক্রের মূলহোতা ও অর্থের যোগানদাতাদের—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। নইলে দেশের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি উভয়ই মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।


