আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালীন সময়ে ভোলা জেলায় দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এক বিস্তৃত প্রভাব ও বিত্তবৈভবের গল্পের নাম মইনুল হোসেন বিপ্লব। সাবেক মন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমদের কাছ থেকে দীর্ঘদিনের প্রশ্রয় পাওয়া এই রাজনৈতিক নেতা নিজ জেলায় হয়ে উঠেছিলেন মূর্তিমান আতঙ্ক। অথচ বিপ্লব তোফায়েলের আপন সন্তান নন বরং বড় ভাই আলী আশরাফের ছেলে। কিন্তু সন্তানহীন তোফায়েল আহমদ তাকে ছোটবেলা থেকেই নিজ সন্তান হিসেবে লালন-পালন করেন এবং পরে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিতও করেন।
তোফায়েলের সরাসরি ছায়াতলে থেকেই বিপ্লব ভোলা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের পদ পান। ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে তিনি এক পর্যায়ে জেলার সরকারি দপ্তরগুলো, বিশেষত ঠিকাদারি ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শনসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়ভাবে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয় যেখানে বিপ্লবের অনুমতি ছাড়া যেন একটি গাছের পাতাও নড়তে পারত না।
শুধু বিপ্লবই নন, তার বড় ভাই আলী আজম মুকুলকেও রাজনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করেন তোফায়েল আহমেদ। দলের মনোনয়ন এনে তাকে ভোলা-২ আসনের সংসদ সদস্য করা হয়। তবে বর্তমানে তিনি হত্যাসহ একাধিক মামলায় জেলে আছেন।
সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিপ্লব এবং তার স্ত্রী ইসরাত জাহান বিন্তির নামে প্রায় ৩৪ কোটি টাকার সম্পদের তথ্য উদঘাটন করে। এই দম্পতির অর্জিত মোট সম্পদের মধ্যে ১২ কোটিরও বেশি টাকার কোনো বৈধ উৎস পাওয়া যায়নি। ফলে দুদক তাদের বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেছে। উল্লেখ্য, ইসরাত জাহান বিন্তি সাবেক বিমান ও পর্যটনমন্ত্রী একেএম শাহজাহান কামালের কন্যা। বর্তমানে এই দম্পতি দুজনই আত্মগোপনে রয়েছেন।
দুদকের অনুসন্ধানে বিপ্লবের আয়কর নথি ঘেঁটে দেখা যায়, তিনি কয়েক বছরের ব্যবধানে ৭৫ কোটি টাকারও বেশি আয়ের তথ্য দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে রেমিট্যান্স, ভুয়া ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, গাড়ি বিক্রি ও মাছ চাষ খাতের আয়ের উল্লেখ। তবে দুদকের অনুসন্ধানে এসব আয়ের কোনো বৈধ ও গ্রহণযোগ্য প্রমাণ মেলেনি। একাধিকবার নোটিশ দেওয়ার পরও এই আয়সমূহের পক্ষে যথাযথ কাগজপত্র দাখিল করতে ব্যর্থ হন তিনি।
ভোলা বিশেষ জজ আদালতে রোববার দাখিল হওয়া মামলার নথি অনুযায়ী, ৪১টি দলিলে বিপ্লবের নামে মোট ১৩ কোটি ৬ লাখ টাকার সম্পদের প্রমাণ মেলে। এর মধ্যে রয়েছে বনানীর বাড়ি ও ফ্ল্যাটসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এছাড়া শেয়ার, ব্যাংক স্থায়ী আমানত এবং ব্যবসায়িক বিনিয়োগের মাধ্যমে পাওয়া গেছে আরও ২০ কোটি ৬৩ লাখ টাকার সম্পদ। সব মিলিয়ে বিপ্লবের নামে পাওয়া গেছে ৩৩ কোটি ৭০ লাখ টাকার সম্পদ। যদিও তার মোট বৈধ আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় বৈধভাবে অর্জিত অর্থের ঘাটতি ধরা পড়ে ১১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার বেশি। অন্যদিকে তার স্ত্রী ইসরাত জাহান বিন্তির নামে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের পরিমাণ ৩৯ লাখ ৪২ হাজার টাকা।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭ ধারা অনুযায়ী বিপ্লব এবং তার স্ত্রী বিন্তির বিরুদ্ধে পৃথক দুটি মামলা দায়ের করেন দুদকের সহকারী পরিচালক খোন্দকার কামরুজ্জামান। মামলার বর্ণনায় উল্লেখ করা হয়েছে, তদন্তে আরও কোনো অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিললে সেসব তথ্যও আদালতে পেশ করা হবে।
এই ঘটনা নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে ভোলা জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম নবী আলমগীর বলেন, “এটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ আমলে ভোলায় চলা বেপরোয়া লুটপাটের একটি ছোট্ট উদাহরণ। বিপ্লব মাত্র ৩৩ কোটি টাকার মালিক নন, তার আরও অনেক সম্পদ রয়েছে যা এখনও অনুসন্ধানে প্রকাশ পায়নি। আওয়ামী শাসনামলে পৌরসভা, এলজিইডি, ফ্যাসিলিটিজ ও গণপূর্তসহ সব সরকারি দপ্তর ছিল তার নিয়ন্ত্রণে। এর পেছনে ছিলেন তার পালক পিতা তোফায়েল আহমেদ।”
তবে এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে মইনুল হোসেন বিপ্লব এবং তার স্ত্রী ইসরাত জাহান বিন্তির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।
এই ঘটনায় ভোলার স্থানীয় রাজনীতি এবং আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। তদ্বির, পারিবারিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক প্রশ্রয়ের মাধ্যমে কীভাবে কেউ জেলাভিত্তিক ক্ষমতার বলয়ে উঠে আসে এবং পরে সেটিকে দুর্নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করে—বিপ্লব তারই এক প্রভাবশালী উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

