পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে জালিয়াতি রোধে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ভিয়েতনাম সরকার। এই লক্ষ্যে গতকাল একটি নতুন নির্দেশনা জারি করেছে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, মূলত যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এবং ওয়াশিংটনের আরোপিত সম্ভাব্য শুল্ক এড়ানোর উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
নির্দেশনায় ভিয়েতনাম সরকার জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র যে বাড়তি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, তা ফাঁকি দিতে কিছু প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের উৎপত্তিস্থল গোপন করে ভিয়েতনামের নাম ব্যবহার করছে। এতে মূলত চীনের তৈরি পণ্য অবৈধভাবে ভিয়েতনামের রফতানিকারক হিসেবে উপস্থাপিত হচ্ছে এবং কম শুল্কের সুযোগ নিয়ে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করছে। এই প্রক্রিয়া অবৈধ ট্রান্সশিপমেন্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে এবং এর বিরুদ্ধেই অবস্থান নিয়েছে হ্যানয়।
ভিয়েতনাম সরকার আশঙ্কা করছে, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক নীতির কারণে বাণিজ্যে জালিয়াতির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে। ফলে আমদানি নিষেধাজ্ঞা এড়ানো কঠিন হয়ে পড়বে এবং এতে করে দেশের বৈদেশিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এ প্রেক্ষাপটে সরকার আমদানিকৃত কাঁচামালের উৎস আরও নিবিড়ভাবে যাচাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
যদিও নির্দেশনায় সরাসরি কোনো দেশের নাম উল্লেখ করা হয়নি, তবে ভিয়েতনামের মোট আমদানির প্রায় ৪০ শতাংশই আসে চীন থেকে। আর মার্কিন প্রশাসনের সরাসরি অভিযোগ—চীন শুল্ক ফাঁকি দিতে ভিয়েতনামকে কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করছে। বিশেষত সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই অভিযোগের ভিত্তিতে ভিয়েতনামের পণ্যের ওপর ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের পরিকল্পনা করেছিল। যদিও সেই সিদ্ধান্ত চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত স্থগিত রাখা হয়েছে তবে তা কার্যকর হলে ভিয়েতনামের যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর রফতানি এবং সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে ভিয়েতনামের প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিনহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন, মার্কিন উদ্বেগের মূল বিষয়গুলো—যেমন পণ্যের উৎপত্তিস্থলের জালিয়াতি, নকল পণ্য এবং অবৈধ ব্যবসা—বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পর্যালোচনা করতে হবে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্কে আস্থা ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর লক্ষ্যেই চলছে তৎপরতা।
এই নির্দেশনা এসেছে এমন এক সময় যখন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং সদ্য ভিয়েতনাম সফর শেষ করেছেন। সফরের সময় তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন যে, ভিয়েতনাম যদি এমন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে যা চীনের বাণিজ্যিক স্বার্থের ক্ষতি করতে পারে তাহলে তা ভবিষ্যতের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। শি জিনপিংয়ের এই সতর্কবার্তার পরপরই ভিয়েতনামের এমন উদ্যোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সার্বিকভাবে এই নির্দেশনা ভিয়েতনামের বৈশ্বিক বাণিজ্য অবস্থানকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে তবে একই সঙ্গে এটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান বাণিজ্য দ্বন্দ্বের প্রতিক্রিয়ায় দেশটির কূটনৈতিক ভারসাম্যের প্রকাশও বটে।

