দুবাইয়ে ‘গোল্ডেন ভিসা’র সুবিধা নিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের দ্বারা গড়ে তোলা বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। প্রাথমিক অনুসন্ধানে কমিশন ৭০ জন বাংলাদেশিকে চিহ্নিত করেছে যাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচারের মাধ্যমে বিদেশে সম্পদ গড়ার অভিযোগ রয়েছে।
এই ৭০ ব্যক্তির কর শনাক্তকরণ নম্বর (ই-টিআইএন) ও আয়কর সংক্রান্ত যাবতীয় নথিপত্র সংগ্রহের জন্য ইতোমধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান বরাবর একটি চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। উপ-পরিচালক ও অনুসন্ধান টিমের প্রধান রাম প্রসাদ মণ্ডলের স্বাক্ষরে প্রেরিত এই চিঠিতে সুইস ব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ পাচার করে দুবাইয়ে সম্পত্তি কেনার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
চিঠিতে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পদমর্যাদা বা বিস্তারিত পরিচয় না থাকলেও নামের তালিকা সংযুক্ত করা হয়েছে। দুদকের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, এনবিআরের কাছে পাঠানো এই তালিকায় উল্লিখিত ৭০ জন সন্দেহভাজনের কর সংক্রান্ত বিস্তারিত নথি সংগ্রহ করে পরবর্তী অনুসন্ধানের ভিত্তি তৈরি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে দুদক মহাপরিচালক আক্তার হোসেন বলেন, “চিঠির বিষয়বস্তু অনুসন্ধান কর্মকর্তার এখতিয়ারভুক্ত। তিনি প্রয়োজন অনুযায়ী যেকোনো নথিপত্র তলব করতে পারেন।”
চিহ্নিত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—আহসানুল করীম, আনজুমান আরা শহীদ, হেফজুল বারী মোহাম্মদ ইকবাল, হুমায়রা সেলিম, জুরান চন্দ্র ভৌমিক, মো. রাব্বী খান, মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ অলিউর রহমান, এস এ খান ইখতেখারুজ্জামান, সাইফুজ্জামান চৌধুরী, সৈয়দ ফাহিম আহমেদ, সৈয়দ হাসনাইন, সৈয়দ মাহমুদুল হক, সৈয়দ রুহুল হক, গোলাম মোহাম্মদ ভূঁইয়া, হাজী মোস্তফা ভূঁইয়া, মনজ কান্তি পাল, মো. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ও মো. মাহবুবুল হক সরকার।
এছাড়া তালিকায় আরও রয়েছেন—মো. সেলিম রেজা, মোহাম্মদ ইলিয়াস বজলুর রহমান, এস ইউ আহমেদ, শেহতাজ মুন্সী খান, এ কে এম ফজলুর রহমান, আবু ইউসুফ মো. আবদুল্লাহ, চৌধুরী নাফিজ সরাফাত, গুলজার আলম চৌধুরী, হাসান আশিক তাইমুর ইসলাম, হাসান রেজা মহিদুল ইসলাম, খালেদ মাহমুদ, এম সাজ্জাদ আলম, মোহাম্মদ ইয়াসিন আলী, মোস্তফা আমির ফয়সাল, রিফাত আলী ভূঁইয়া, সালিমুল হক ঈসা/হাকিম মোহাম্মদ ঈসা, সৈয়দ এ কে আনোয়ারুজ্জামান/সৈয়দ কামরুজ্জামান, সৈয়দ সালমান মাসুদ, সৈয়দ সাইমুল হক, আবদুল হাই সরকার এবং আহমেদ সামীর পাশা।
তালিকাভুক্ত আরও ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন—ফাহমিদা শবনম চৈতি, মো. আবুল কালাম, ফাতেমা বেগম কামাল, মোহাম্মদ আল রুমান খান, মায়নুল হক সিদ্দিকী, মুনিয়া আওয়ান, সাদিক হোসেন মো. শাকিল, আবদুল্লাহ মামুন মারুফ, মোহাম্মদ আরমান হোসেন, মোহাম্মদ শওকত হোসেন সিদ্দিকী, মোস্তফা জামাল নাসের, আহমেদ ইমরান চৌধুরী, বিল্লাল হোসেন, এম এ হাশেম, মোহাম্মদ মাইন উদ্দিন চৌধুরী, নাতাশা নূর মুমু, সৈয়দ মিজান মোহাম্মদ আবু হানিফ সিদ্দিকী, সায়েদা দুররাক সিনদা জারা, আহমেদ ইফজাল চৌধুরী, ফারহানা মোনেম, ফারজানা আনজুম খান, কে এইচ মশিউর রহমান, এম এ সালাম, মো. আলী হোসেন, মোহাম্মদ ইমদাদুল হক ভরসা, মোহাম্মদ ইমরান, মোহাম্মদ রোহেন কবীর, মনজিলা মোর্শেদ, মোহাম্মদ সানাউল্যাহ চৌধুরী, মোহাম্মদ সরফুল ইসলাম, সৈয়দ রফিকুল আলম ও আনিসুজ্জামান চৌধুরী।
দুদকের অনুসন্ধানের পেছনে রয়েছে ২০২৩ সালের ১৬ এপ্রিল প্রেরিত একটি চিঠি, যা বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বরাবর পাঠানো হয়েছিল। একই বছরের ১০ এপ্রিল তিন সদস্যের একটি অনুসন্ধান টিম গঠিত হয়, যা দুবাইয়ে সম্পদ গড়ায় জড়িতদের বিষয়ে খোঁজখবর নিতে কাজ শুরু করে। পরে ২০২৪ সালের ১৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট এক নির্দেশনায় দুদকসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তদন্ত কার্যক্রম শুরু করতে নির্দেশ দেয়।
আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ’ এবং ইউরোপীয় সংগঠন ‘ইইউ ট্যাক্স অবজারভেটরি’ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল পর্যন্ত ৪৫৯ বাংলাদেশির নামে দুবাইয়ে ৯৭২টি সম্পত্তি কেনা হয়। এগুলোর আনুমানিক মূল্য ৩১ কোটি ৩০ লাখ মার্কিন ডলার যা প্রায় তিন হাজার পাঁচশ কোটি টাকার সমান। এই অর্থের উৎস এবং বৈধতা নিয়ে এখন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দুদকের চলমান অনুসন্ধান প্রক্রিয়া ও এনবিআরের সহযোগিতার ওপর নির্ভর করছে এই অর্থপাচার কেলেঙ্কারির চূড়ান্ত তদন্ত ও বিচারিক পদক্ষেপের ভবিষ্যৎ।

