রাজধানীর মিরপুরে একটি ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্থানীয় জনতার হাতে ধরা পড়া এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে তদন্তে দেখা গেছে, পুলিশ নিয়মিত মামলা না করে তাকে পূর্বের একটি মামলার সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। ১৪ এপ্রিল মিরপুরের আফতাবনগর এলাকায় কোরবানির পশুর হাট বসানোর জন্য প্রকাশিত ইজারা বিজ্ঞপ্তির বিরুদ্ধে এক ব্যক্তি ছিনতাই করে পালানোর সময় স্থানীয় জনগণের হাতে ধরা পড়ে। এরপর তাকে মারধরের পর পুলিশ হস্তান্তর করে এবং আহত অবস্থায় তাকে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
কিন্তু, মিরপুর মডেল থানার পুলিশকে জানানো হয়েছে, এই ঘটনার ক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত মামলা না করে, পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। পুলিশ কর্তৃপক্ষ জানায়, এই বিষয়ে তাদের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, অভিযোগটি সঠিকভাবে তদন্ত করে নিয়মিত মামলা গ্রহণ করা উচিত।
এই ঘটনায় আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পুলিশ জানিয়েছে যে, গ্রেপ্তার হওয়া বেশিরভাগ ছিনতাইকারীরা জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ডিএমপির সূত্রে জানা গেছে, ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার করা হলেও, কিছুদিন পর তারা জামিনে বেরিয়ে আবারও একই ধরনের অপরাধে জড়াচ্ছে, যা পুলিশের কাজকে আরও কঠিন করে তুলছে।
অপরাধীদের দ্রুত জামিন পাওয়া এবং পুনরায় অপরাধের পথে ফিরে আসার ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির ৩২০টি মামলায় ৮৫২ জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কিন্তু এসব আসামির মধ্যে অন্তত ১৫০ জন জামিন পেয়ে মুক্ত হয়ে আবারও অপরাধে জড়িয়েছে।
এদিকে, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ছিনতাইকারীদের জামিন নিয়ে অভিযোগ উঠেছে। অনেক ছিনতাইকারী আদালতের কাছ থেকে জামিন পাওয়ার পর পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে, যা পুলিশকে একটি বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। বিশেষত, যাদের বিরুদ্ধে পুনরায় অপরাধ করা হচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে পুনরায় কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা মনে করছেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেছেন, “আইনি প্রক্রিয়াগত ঘাটতির কারণে ছিনতাইয়ের মতো অপরাধগুলো বাড়ছে, যা নাগরিকদের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এ অবস্থা নাগরিকদের জন্য আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।” তিনি বলেন, “অপরাধীদের বিরুদ্ধে যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে আইনি প্রক্রিয়ার সংস্কার করা জরুরি।”
এছাড়া, পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এও বলা হয়েছে যে, অপরাধীদের জামিনে মুক্ত হওয়ার বিষয়টি তদন্ত করতে হবে এবং দুর্বল মামলাগুলো যাতে না হয়, সে বিষয়ে পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পুলিশ চায়, আসামিদের জামিনের পথে যাতে কোনো ধরনের অসুবিধা না আসে, সেজন্য তাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা থাকতে হবে।
এদিকে, ছিনতাইয়ের কারণে রাজধানীতে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ছে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, অপরাধীরা চাপাতি বা অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিদের কাছ থেকে টাকা ও মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিচ্ছে। এই সিসিটিভি ফুটেজগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মধ্যে আরও বেশি আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া, মিরপুর থানার ওসি মো. সাজ্জাদ রোমন জানাচ্ছেন যে, অভিযুক্ত আকিবের গ্রেপ্তার হওয়ার পর, ভুক্তভোগী না পাওয়ায় তাকে পুরনো মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, আদালত যে ব্যাখ্যা চেয়েছেন, সে সম্পর্কে তারা যথাযথভাবে তথ্য সরবরাহ করবেন।
রাজধানীতে ছিনতাইয়ের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় একদিকে যেমন মানুষের জীবনে উদ্বেগ সৃষ্টি হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যবসায়িক পরিবেশও এর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাতের বেলা লোকজন আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, পাশাপাশি তাদের জীবনের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে পড়ছে।
অপরাধীদের জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় একই অপরাধে জড়িয়ে পড়া এবং ছিনতাইয়ের মতো অপরাধের আশঙ্কা রোধে আইনি পদক্ষেপের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা। আর পুলিশের পক্ষ থেকে অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদ দেওয়া হয়েছে, যাতে এই ধরনের অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হয়।

