গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর গ্রেপ্তার হন মন্ত্রী, এমপি ও শীর্ষ নেতারা। এখন তাদের জীবন সীমাবদ্ধ কারাগারের চার দেয়ালের মধ্যে।
কারাগার সূত্র বলছে, বন্দিদের অনেকের আচরণ এখন উচ্ছৃঙ্খল ও অনিয়ন্ত্রিত।
কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগার ও গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারে রাখা হয়েছে ১২৫ জন ভিআইপি বন্দিকে। এর মধ্যে ১২২ জন পুরুষ ও ৩ জন নারী।
এছাড়া খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামের কারাগারে রয়েছেন আরও ২০ জন ভিআইপি বন্দি। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৪১ জন ভিআইপি বন্দি ডিভিশন সুবিধা পেয়েছেন। তারা আলাদা কক্ষে থাকার সুযোগ পেয়েছেন। প্রত্যেকের জন্য নিয়োগ করা হয়েছে একজন করে সেবক।
কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক (উন্নয়ন) জান্নাত-উল-ফরহাদ জানিয়েছেন, দেশে এখন মোট ১৪৫ জন ভিআইপি বন্দি রয়েছেন। তাদের কারা বিধিমালা অনুযায়ী সেবা দেওয়া হচ্ছে।
তবে কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, ভিআইপি বন্দিদের অনেকেই নিয়ম-কানুন মানছেন না। কেউ কেউ আদালতে যাওয়ার পথে পুলিশের সঙ্গে আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলছেন।
অনেকে অতিরিক্ত টিভি ও পত্রিকা চাচ্ছেন। আবার কেউ কেউ নিজের মতো করে থাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন।
ফলে কারা কর্তৃপক্ষকে পড়তে হচ্ছে নানা বিড়ম্বনায়।
কেরানীগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দিদের মধ্যে রয়েছেন সালমান এফ রহমান, হাসানুল হক ইনু, আনিসুল হক, রাশেদ খান মেনন, শাজাহান খান, কাজী জাফরউল্লাহ, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম, ইমরান আহমেদ, কর্নেল (অব.) ফারুক খান, আসাদুজ্জামান নূর, নারায়ণ চন্দ্র চন্দ, ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, আরিফ খান জয় ও ড. তৌফিক-ই-এলাহী চৌধুরী।
আরও রয়েছেন ড. আব্দুর রাজ্জাক, সাধন চন্দ্র মজুমদার, দীপু মনি, তাজুল ইসলাম, র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, ফরহাদ হোসেন, শামসুল হক টুকু, সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম, বিতর্কিত সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, এ বি তাজুল ইসলাম, জুনাইদ আহমেদ পলক, অ্যাডভোকেট বলরাম পোদ্দার, নজরুল ইসলাম মজুমদার, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও টিপু মুনশি।
তালিকায় আরও আছেন মাহবুব আরা বেগম গিনি, বিতর্কিত সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, রমেশ চন্দ্র সেন, সাবেক মুখ্য সচিব নজিবুর রহমান, ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তানভীর হাসান সৈকত, সাবেক এমপি কামাল আহমেদ মজুমদার, হাজী সেলিম, সৈয়দ সায়েদুল হক সুমন, আহমেদ হোসেন, সাদেক খান, বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, সাবেক অফিস সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপ, সাবেক এনএসআই পরিচালক কমোডর মনিরুল ইসলাম, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া, বরখাস্ত হওয়া সাবেক ডিসি মশিউর রহমান, বরখাস্ত হওয়া অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ হিল কাফী, পুলিশের সাবেক আইজিপি চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল মামুন ও শহীদুল হক।
ভিআইপি বন্দিদের জন্য আলাদা সেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
প্রতিটি সেলে দু’জন বা তিনজন বন্দি থাকছেন। সেলে রয়েছে চৌকি, কম্বল, বালিশ, মগ, থালা ও বাটি। তাদের জন্য পৃথকভাবে রান্না করা হয়। প্রতিদিন সরবরাহ করা হয় দুটি পত্রিকা।
সেলগুলো একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্নভাবে রাখা হয়েছে। এক সেল থেকে অন্য সেলে যেতে হলে মাঠ পেরোতে হয়।
কারাগারে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছেন সালমান এফ রহমান। গোলাপ সেলে প্রথমে তার সঙ্গী ছিলেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান ও সাবেক কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক। তাদের সঙ্গে বনিবনা হয়নি। সালমান প্রায়ই অতিরিক্ত দাবি তুলতেন এবং চিৎকার করতেন। ২৫ ফেব্রুয়ারি ফোনে কথা বলার সময় তাকে কারারক্ষীরা দেখতে পান। পরে সেলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ফারুক খান ও আবদুর রাজ্জাক কারা কর্তৃপক্ষকে সালমানকে অন্য সেলে সরানোর অনুরোধ জানান। শেষ পর্যন্ত সালমানকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি টিভির জন্য আবেদন করেছিলেন, তবে আবেদন নাকচ করা হয়।
অন্যদিকে সাবেক আইজিপি আব্দুল্লাহ আল মামুন ও সাবেক মেয়র আতিকুল ইসলাম গোলাপ সেলের পাশে একসঙ্গে আছেন। মামুন সারাদিন বই পড়ে সময় কাটান। তার স্ত্রী বই পাঠিয়েছেন। অন্যদিকে আবদুর রাজ্জাক মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। তিনি প্রায়ই বিষণ্ণ হয়ে একা বসে কাঁদেন।
শাজাহান খান কারাগারে আরেকটি সমস্যা তৈরি করেছেন। গাড়িতে ওঠার সময় তিনি হ্যান্ডক্যাপ পরতে রাজি হন না। পুলিশের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন। অনেক সময় গালিগালাজ করেন এবং ‘রাজাকারের বাচ্চা’ বলে গালি দেন।
সেল জীবনে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন জুনাইদ আহমেদ পলক। তিনি অধিকাংশ সময় গান গেয়ে সময় কাটান। তার সঙ্গী আছেন সাবেক মুক্তিযোদ্ধা প্রতিমন্ত্রী এ বি তাজুল ইসলাম।
কারা সূত্র বলছে, এসব ভিআইপি বন্দিদের কারণে কারা কর্তৃপক্ষ অতিরিক্ত চাপ ও বিড়ম্বনায় পড়েছে।
তবে তারা নিয়মের বাইরে বাড়তি কোনো সুবিধা দিচ্ছে না বলেও জানিয়েছে।

