ব্যবসায়ী পরিচয়ে নিজেকে তুলে ধরলেও আয়কর নথিতে ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা জুনায়েদ ইবনে সিদ্দিকীর বার্ষিক আয় তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার বেশি নয়। অথচ বিভিন্ন ব্যাংকে তাঁর নামে থাকা ২৯টি হিসাবে জমা হয়েছে ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকারও বেশি। শুধু তাই নয় তাঁর গৃহিণী স্ত্রী ফাতেমাতুজ জোহরার নামে ১৬টি ব্যাংক হিসাবে রয়েছে আরও প্রায় ১১ কোটি টাকা। রাজধানীর মোহাম্মদপুরে রয়েছে একটি পাঁচতলা বাড়ি এবং একটি ফ্ল্যাটও।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দীর্ঘ চার বছরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আমদানি-রপ্তানির ব্যবসার আড়ালে বিদেশ থেকে ইয়াবা তৈরির কাঁচামাল এনে বিক্রি করতেন জুনায়েদ। মাদক ব্যবসা করেই তিনি এবং তাঁর আত্মীয়স্বজন বিপুল পরিমাণ অর্থ ও সম্পদের মালিক হয়েছেন। এ বিষয়ে জুনায়েদ, তাঁর স্ত্রীসহ ৮ সহযোগীর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা করেছে অধিদপ্তর।
মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ, ফারহানা আফ্রিন, দীন ইসলাম, কুদ্দুস মিয়া, মামুন, রতন কুমার মজুমদার ও নজরুল ইসলাম রয়েছেন। এদের মধ্যে ফারহানা, দীন ইসলাম ও নজরুল জুনায়েদের আত্মীয়। মামলার বাদী মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. আলী আসলাম হোসেন জানান, চার বছর অনুসন্ধান চালিয়ে জুনায়েদ, তাঁর স্ত্রী ও সহযোগীদের ব্যাংক হিসাব, বাড়িঘর ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহের পর মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালতের আদেশে তাঁদের ব্যাংক হিসাব ইতোমধ্যেই অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
২০২০ সালের ৯ সেপ্টেম্বর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজ থেকে ১২ কেজি ৩২০ গ্রাম অ্যামফিটামিন জব্দ হওয়ার পর তদন্ত শুরু হয়। ওই সময় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা করলেও পরবর্তীতে তদন্তে উঠে আসে জুনায়েদের নাম। এরপর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বিস্তৃত অনুসন্ধানে নামে এবং সামনে আসে তাঁদের কোটি কোটি টাকার সম্পদের হিসাব।
সম্প্রতি এ ঘটনায় পিবিআই আদালতে অভিযোগপত্র জমা দিয়েছে। এতে জুনায়েদ, আজাদ, নজরুলসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়। এদের মধ্যে সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং তারা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। জুনায়েদের স্ত্রীসহ তিনজন এখনো পলাতক।
জুনায়েদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুরান ঢাকার আইডিএস ট্রেডার্সের মাধ্যমে তিনি গোপনে মাদকদ্রব্যের কাঁচামাল আমদানি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আয়কর নথি অনুযায়ী ২০১৫–১৬, ২০১৮–১৯ ও ২০১৯–২০ অর্থবছরে তাঁর বার্ষিক আয় তিন লাখ থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও অনুসন্ধানে দেখা যায়, তাঁর নামে ২৩টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে যেখানে জমা হয়েছে প্রায় ২৩ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিন কোটি ৩০ লাখ টাকার এফডিআরও করেছেন তিনি।
মামলার এজাহারে উল্লেখ রয়েছে, মাদক ব্যবসার আয় দিয়ে জুনায়েদ নামে-বেনামে বাড়ি ও গাড়ি কিনেছেন। তাঁর পাঁচতলা বাড়ির অবস্থান মোহাম্মদপুরের বাঁশবাড়ী এলাকায় বলে দাবি করা হলেও ২৬ এপ্রিল সেখানে গিয়ে বাড়িটির অস্তিত্ব মেলেনি। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি বর্তমানে সাততলা একটি ভবনে বসবাস করেন। তবে সেই ভবনের দারোয়ান তাঁর উপস্থিতির কথা অস্বীকার করেছেন। এ বিষয়ে মামলার বাদী আলী আসলাম হোসেন বলেন, ওই এলাকায় জুনায়েদের পাঁচতলা বাড়ি রয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম জানান, অভিযুক্তদের নাম–ঠিকানা যাচাই করে আদালতে প্রতিবেদন দেওয়া হবে।
জুনায়েদের আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক দাবি করেছেন, তাঁর মক্কেল একজন বৈধ কেমিক্যাল ব্যবসায়ী এবং তাঁকে হয়রানি করার জন্যই এই মামলা করা হয়েছে। তবে পিবিআইয়ের অভিযোগপত্রে উল্লেখ রয়েছে, জুনায়েদ দীর্ঘদিন ধরেই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তিনি ভারত, মিয়ানমার, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, হংকংসহ বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন এবং ভারতীয় নাগরিক সতীশ কুমার সিলভারাজের সহায়তায় মাদক পাচার করতেন।
জুনায়েদের স্ত্রী জোহরার কোনো বৈধ আয় নেই তবুও তাঁর নামে থাকা ১৬টি ব্যাংক হিসাবে জমা রয়েছে ১০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪ কোটি টাকার এফডিআর রয়েছে। অপরদিকে আত্মীয় ফারহানার নামে ৬ কোটি ৪৩ লাখ টাকা জমার তথ্য পাওয়া গেছে। ব্যাংক হিসাব খোলার সময় তিনিও নিজেকে গৃহিণী পরিচয় দিয়েছিলেন।
জুনায়েদ তাঁর অবৈধ অর্থ ফুফাতো ভাই দীন ইসলামের ব্যাংক হিসাবেও রেখেছেন। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীন ইসলাম পুরান ঢাকায় জুনায়েদের গোডাউনে অ্যামফিটামিন সংরক্ষণ করতেন এবং তা বিশেষ প্রক্রিয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠাতেন। তাঁর ১০টি ব্যাংক হিসাবে রয়েছে ৫৩ লাখ টাকা।
আবুল কালাম আজাদকে জুনায়েদের অন্যতম সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁর ছয়টি ব্যাংক হিসাবে রয়েছে প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। সাভারে তাঁর একটি ছয়তলা বাড়িও রয়েছে যদিও মামলা এজাহারে তা তিনতলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বাড়িটি তিনি তিন বছর আগে বিক্রি করে দিয়েছেন।
এ বিষয়ে আলী আসলাম হোসেন বলেন, তিনি সরেজমিনে গিয়ে বাড়ি দেখেছেন তবে বিক্রির তথ্য তাঁর জানা ছিল না।
তদন্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম জানিয়েছেন, জুনায়েদ, আজাদসহ অভিযুক্তদের বাড়ি-গাড়িসহ সব সম্পদ ক্রোক করার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জুনায়েদের আরেক সহযোগী কুদ্দুস মিয়া বিভিন্ন সময়ে তাঁর ব্যাংক হিসাবে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা জমা দিয়েছেন। অপর সহযোগী মামুন জমা দিয়েছেন চার লাখ ৬৯ হাজার টাকা এবং রতন কুমার মজুমদার দিয়েছেন ছয় লাখ ৮০ হাজার টাকা। নজরুল ইসলাম জমা দিয়েছেন সাড়ে নয় লাখ টাকা, যিনি জুনায়েদের মামাশ্বশুর।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা খোরশেদ আলম জানান, জুনায়েদ, তাঁর স্ত্রী এবং আত্মীয়স্বজনের আরও সম্পদের খোঁজ চলছে। শিগগিরই মানি লন্ডারিং মামলায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হবে।

