২০২৫ সালের ২৭ মার্চ ঢাকার নির্বাচনী ট্রাইবুনাল বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেনকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে ঘোষণা দেন। মামলাটির পুরো বিচারপ্রক্রিয়া ও রায় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে নানা দিক থেকে—বিশেষ করে আইনগত বৈধতা, আদালতের গতি এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা ঘিরে।
সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ন-সদস্য সচিব জাহিরুল ইসলাম মুসা তার ব্যক্তিগত ফেসবুক পোস্টে বিচারিক ধারাবাহিকতা, সম্ভাব্য অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দায়ভার নিয়ে লিখেন যে-
মামলার শুরু থেকে বিচারকাজের গতি ছিল ধীর। ২০২০ সালের ৩ মার্চ ইশরাক হোসেন নির্বাচন ট্রাইবুনালে (মামলা নং ১৫/২০২০) শেখ তাপসের মেয়র হিসেবে বিজয় ঘোষণার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মামলা দায়ের করেন। ওই গেজেট প্রকাশিত হয়েছিল ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০। মামলায় শুরুতে শেখ তাপসসহ ৮ জনকে বিবাদী করা হয়। ইশরাক নিজে আরজিতে স্বাক্ষর করেন এবং হলফনামা সম্পাদন করেন আদালতে উপস্থিত থেকে।
প্রথম ৩ বছর ৫ মাসে এই মামলায় ৩২টি তারিখ নির্ধারিত হয় যার মধ্যে একমাত্র দৃশ্যমান অগ্রগতি ছিল ১নং বিবাদীর জবাব গৃহীত হওয়া এবং একটি দরখাস্ত শুনানির অপেক্ষায় থাকা। কিন্তু ৯ অক্টোবর ২০২৪ থেকে শুরু করে মাত্র চার মাসের মধ্যে— ডিসেম্বরের ছুটি বাদ দিলে—১৭টি তারিখে শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং চূড়ান্ত রায় আসে ২৭ মার্চ ২০২৫। এই অস্বাভাবিক দ্রুততা সাধারণ বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেই প্রতীয়মান।

২০২৪ সালের ১০ নভেম্বর মামলায় দুইটি গুরুত্বপূর্ণ দরখাস্ত দাখিল করা হয়—একটি ছিল আরজি সংশোধনের, আরেকটি নির্বাচন কমিশনের সচিবকে ৯ নম্বর বিবাদী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার। কিন্তু এই দরখাস্তে বাদী ইশরাক নিজে হলফ করেননি। বরং বরিশালের রাজিব বেপারী নামের এক ব্যক্তি হলফনামা সম্পাদন করেন। দেওয়ানি কার্যবিধির আলোকে শুধুমাত্র বাদীর স্বীকৃত প্রতিনিধি (recognized agent)—যিনি সাধারণত পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি প্রাপ্ত তিনিই এই কাজ করতে পারেন। কিন্তু রাজিব বেপারীর হাতে কোনো পাওয়ার অফ অ্যাটর্নি ছিল না এমন দাবি মামলার কাগজেই অনুপস্থিত।
এই বেআইনি হলফনামার ভিত্তিতে ট্রাইবুনাল দরখাস্ত দুটি মঞ্জুর করেন এবং এখান থেকেই শুরু হয় মামলার মোড় ঘোরানোর প্রক্রিয়া। সংশোধিত আরজির মাধ্যমেই ইশরাককে মেয়র ঘোষণা করার এবং সংশ্লিষ্ট গেজেট বাতিলের আবেদন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ৩৭(২) ধারা অনুযায়ী শুধুমাত্র নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীই এই ধরনের প্রতিকার চাইতে পারেন।
২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি, ইশরাকসহ বাদীপক্ষের সাক্ষীরা আদালতে হাজির না হয়ে আইনজীবী সমিতির ভবনে সাক্ষ্য দেওয়ার অনুমতির জন্য কমিশন নিয়োগের আবেদন করে। কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, ইশরাক শারীরিকভাবে অসুস্থ এবং নানা দায়িত্বে ব্যস্ত। হলফনামায় সাক্ষী হিসেবে উঠে আসে এক নতুন নাম—মঞ্জুরুল ইসলাম—যিনি নিজেকে মামলার বাদী হিসেবে উল্লেখ করেন। অথচ আদালতের নথিতে এমন কোনো সংশ্লেষ নেই। পরবর্তীতে ২৭ জানুয়ারি ট্রাইবুনালের কমিশনেই ৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়, যার মধ্যে ইশরাকও ছিলেন। তবে তার সাক্ষরে ব্যবহৃত স্বাক্ষর পূর্বের নথিভুক্ত স্বাক্ষরের সঙ্গে মিল ছিল না।

সুপ্রীম কোর্টের আইনজীবী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির যুগ্ন-সদস্য সচিব জাহিরুল ইসলাম মুসা তার পোস্টে উল্লেখ করে লিখেছেন, ২ ফেব্রুয়ারি মঞ্জুরুল ইসলাম ফের একটি সংশোধনের দরখাস্ত দেন। যেখানে তিনি আবার নিজেকে বাদী বলে দাবি করেন এবং স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) নির্বাচন বিধিমালা ২০১০-এর ৫৯(খ) যুক্ত করেন। আবারও ট্রাইবুনাল তা মঞ্জুর করে।
সবশেষে ২৭ মার্চ ২০২৫ বিজ্ঞ ট্রাইবুনাল রায় দেন ইশরাক হোসেনের পক্ষে। তবে এই রায় কার্যত অকার্যকর বা “infructuous” হয়ে যায় কারণ এর পূর্বে ১৭ আগস্ট ২০২৪ সালে সরকার স্থানীয় সরকার আইন সংশোধন করে প্রশাসক নিয়োগের বিধান যুক্ত করে এবং ১৯ আগস্ট শেখ তাপসকে অপসারণ করে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয়।
এই প্রেক্ষাপটে আদালতের রায় কার্যকর থাকার কোনো সুযোগ নেই। উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায় অনুযায়ী, আদালত এমন কোনো আদেশ দেয় না যা বাস্তবিকভাবে ফাঁকা বা ফলহীন (“futile”)।
আরও প্রশ্ন ওঠে মামলার বিবাদীদের ভূমিকা নিয়ে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার, সচিব ও রিটার্নিং অফিসার মামলাটি কনটেস্ট করেননি। এমনকি রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে গিয়েও প্রশ্ন তোলেননি। তবে কেন? এ বিষয়ে তাদের জবাব দেওয়ার দায় আছে।

রায় ঘোষণার এক মাসের মাথায়, ২৭ এপ্রিল গভীর রাতে নির্বাচন কমিশন ইশরাক হোসেনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে সংশোধিত গেজেট প্রকাশ করে। অথচ আইন মন্ত্রণালয় পরবর্তীতে জানায়, তারা এ বিষয়ে কোনো মতামত দেয়নি। গেজেট প্রকাশের আগে নির্বাচন কমিশন আইন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে পরামর্শ না করে নিজে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয় যা কার্যত প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কমিশনের উচিত ছিল এর যৌক্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া এবং নিজেদের স্বাধীন অবস্থান স্পষ্ট করা।
এই মুহূর্তে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ইশরাকের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে বাধ্য কি না— সেই প্রশ্নের উত্তর হলো ‘না’। কারণ ইতোমধ্যে আইন সংশোধন করে বর্তমান মেয়রকে অপসারণ করে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া এই মামলায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় বিবাদী ছিল না এবং রায়েও তাদের ওপর কোনো নির্দেশনা নেই।
সব মিলিয়ে ইশরাক বনাম তাপস মামলাটি শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী বিরোধ নয়—এটি হয়ে উঠেছে বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, আইন প্রয়োগের নিরপেক্ষতা এবং সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব নিয়ে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বচ্ছ ও যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক ভিত্তি রক্ষায় এ দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

