দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত আট মাসে সম্পদ ক্রোক ও ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করার ক্ষেত্রে নজিরবিহীন সাফল্য দেখিয়েছে। ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে দেশে এবং বিদেশে অবস্থানরত দুর্নীতিবাজ, অর্থপাচারকারী, ঋণখেলাপি ও সরকারি অর্থ আত্মসাৎকারীদের অন্তত শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এমন নজির এর আগে দেখা যায়নি।
এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ জব্দের তালিকায় আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার বোন রেহানা সিদ্দিকের পরিবারের সদস্য, শিকদার গ্রুপ, এস আলম গ্রুপ, নাবিল গ্রুপ, আওয়ামী লীগের সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি, আমলা, সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক সদস্য মতিউর রহমানসহ বিভিন্ন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পুরো বছরে ক্রোক ও অবরুদ্ধ সম্পদের পরিমাণ ছিল মাত্র ৩৬১ কোটি টাকা। আর ২০২০ থেকে ২০২৪ সালের পাঁচ বছরে এ ধরনের সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় তিন হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। অথচ গত আট মাসে একাই এই অঙ্ক ছাড়িয়েছে ১৩ হাজার কোটি টাকা, যা দুর্নীতি দমন অভিযানে একটি নতুন রেকর্ড।
দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ভেতরে গত আট মাসে প্রায় ১২ হাজার ১৩৮ কোটি টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ক্রোক করা হয়েছে। একই সময়ে আদালতের আদেশে ৭৭৩ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে। বিদেশেও ১২০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক এবং ৪৫ কোটি টাকার ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে রয়েছে দেশে ১৯১ একর জমি, ২৮টি বাড়ি, ৩৮টি ফ্ল্যাট, ১৫টি প্লট, ২৩টি গাড়ি এবং ৫৮২টি বিদেশি ফ্ল্যাট। এ ছাড়া আছে ২৩টি কোম্পানির আট লাখ ৮৮ হাজার ডলার, ৮৬ লাখ ইউরো, তিনটি কোম্পানি ও তিনটি জাহাজ। ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধ হয়েছে এক হাজার ১০টি, যেখানে জমা রয়েছে ৮১৭ কোটি টাকা। শেয়ার অবরুদ্ধ হয়েছে প্রায় ৮ হাজার ৭১৩ কোটি টাকার। রয়েছে ৬৬০ গ্রাম সোনা, এক লাখ ৬৯ হাজার ডলার, ৫৫ হাজার ইউরো এবং নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিও অ্যাকাউন্টে থাকা নয় কোটি টাকা। এ ছাড়া ব্যাংক হিসাবে রয়েছে সাত লাখ ডলার ও ২৮ লাখ ইউরো।
এই বিপুল সম্পদ ক্রোকের বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন বলেন, “গত আট মাসে যে পরিমাণ সম্পদ ক্রোক ও অবরুদ্ধ করা হয়েছে তার পরিমাণ নিঃসন্দেহে বিশাল। এর আগে এত স্বল্প সময়ে এত সম্পদ জব্দের নজির নেই।” তিনি আরও জানান, সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট এবং বিভিন্ন বিভাগ মিলে এসব সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করছে।
২০১৯ সালে পৃথক ইউনিট হিসেবে যাত্রা শুরু করা দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিট সাধারণত আদালতের ভিন্ন নির্দেশনা না থাকলে এসব সম্পদের দেখভালের দায়িত্ব পালন করে থাকে।
দুদক সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে এই ইউনিট আদালতের আদেশে ১৭০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক এবং ১৯০ কোটি টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করেছে। আগের বছর ২০২৩ সালে ক্রোক করা হয় ২৮৩ কোটি টাকার সম্পদ, আর অবরুদ্ধ করা হয় ১৩২ কোটি টাকার সম্পদ। ২০২২ সালে এই অঙ্ক আরও বেশি ছিল—৫৮৫ কোটি টাকা সম্পদ ক্রোক এবং ২২৪ কোটি টাকা ও ২৮ হাজার ডলার অবরুদ্ধ করা হয়। ২০২১ সালে ক্রোক করা হয় ৩২৬ কোটি টাকার সম্পদ এবং অবরুদ্ধ করা হয় এক হাজার ১৬১ কোটি টাকার সম্পদ, সঙ্গে ছিল বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রাও। ২০২০ সালে ছিল ১৮০ কোটি টাকার সম্পদ ক্রোক এবং ১৫২ কোটি টাকার অবরুদ্ধ সম্পদ।
গত বছরের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই দুদক দুর্নীতির বিরুদ্ধে জোরালো অভিযান শুরু করে। সেই ধারাবাহিকতায় শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনুসন্ধানে নামে তারা। এসব অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয় দেশজুড়ে ব্যাপক অর্থপাচার ও দুর্নীতির জাল যার ভিত্তিতে আদালতের নির্দেশে সম্পদ জব্দের এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এই অভিযান একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষায় বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে তেমনি দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবেও তা বিবেচিত হচ্ছে। এর ফলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে জনআস্থা ও বিচার প্রক্রিয়ার গতি আরও বাড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

