বেসরকারি ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পাঁচ বছরেও পূরণ করতে পারেনি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। ৫০টি আসনের মেডিকেল কলেজের জন্য ২৫০ শয্যার হাসপাতাল ও ৭০ শতাংশ রোগী ভর্তি থাকার বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও, তাদের হাসপাতালের শয্যা ২০০-এরও কম এবং রোগী ভর্তি হার ১ শতাংশেরও কম। যদিও কলেজ কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা ৩০০ শয্যার হাসপাতাল তৈরি করেছে এবং ২০২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর উদ্বোধন করেছে, তবে এখনো পুরোদমে রোগী ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়নি। গুলশানের ইউনাইটেড হাসপাতালে শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথাও তারা জানায়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ ২০১৯ সালে ৫০ আসনে ভর্তি শুরু করার অনুমতি পায়। এরপর তাদের শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হয়। বর্তমানে তারা বাড্ডার মাদানী অ্যাভিনিউয়ে নিজস্ব ক্যাম্পাসে অবস্থিত। ২০২২ সালে সরকার ‘বেসরকারি মেডিকেল কলেজ ও ডেন্টাল কলেজ আইন’ কার্যকর করলেও, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ সে আইন মানতে ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাত সদস্যের একটি পরিদর্শন দল কলেজটি পরিদর্শন করে। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৫০ শয্যার পরিবর্তে মাত্র ২০০ শয্যা রয়েছে এবং রোগী ভর্তি হার মাত্র ১ শতাংশ। এছাড়া, ক্লিনিক্যাল স্কিল ল্যাবের ঘাটতিতেও শিক্ষার্থীরা যথাযথ প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন না।
আইন অনুযায়ী, মেডিকেল কলেজ চালুর ন্যূনতম দুই বছর আগে হাসপাতাল চালু থাকতে হবে। যেখানে শিক্ষার্থী প্রতি পাঁচটি শয্যার অনুপাতে শয্যা থাকবে এবং অন্তত ৭০ শতাংশ রোগী ভর্তি থাকতে হবে। অথচ, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মূল কলেজ চালুর তিন বছর পর। শুরুর দিকে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ ওঠে এবং তখন হাসপাতালের নিবন্ধন না থাকায় সরকার তাৎক্ষণিকভাবে এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। ২০২৩ সালের শেষে তারা নিবন্ধন পায়।
স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজকে অনুমোদন দেওয়ার সময় নানা মহলের চাপ ছিল। কিন্তু হাসপাতালের নিবন্ধন স্বাস্থ্যের অধিদপ্তরের তদারকির অভাবে দেওয়া হয়েছিল।
মাদানী অ্যাভিনিউয়ে ইউনাইটেড সিটিতে দুটি হাসপাতাল—‘ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল’ এবং ‘ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেস লিমিটেড’—দুটি হাসপাতালের নিবন্ধন আলাদা এবং রেজিস্ট্রেশন কোডও ভিন্ন। ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ বলছে, তিনটি ভবনে কলেজ, হাসপাতাল ও হেলথকেয়ার সার্ভিস পরিচালিত হচ্ছে, তবে কার্যক্রম পৃথক।
সরেজমিনে দেখা গেছে, নয়তলা ভবনে একাডেমিক কার্যক্রম চলছে, তবে হাসপাতাল ভবনের অনেক অংশ এখনও অসম্পূর্ণ। নিচতলা, দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, ল্যাবরেটরি ও অপারেশন থিয়েটার রয়েছে কিন্তু চতুর্থ থেকে নবম তলা এখনও অসম্পূর্ণ। হাসপাতালজুড়ে নির্মাণকাজ চলছে এবং রোগীর সংখ্যা কম।
অধ্যাপক ডা. আব্দুল ওয়াকিল জানান, ৩০০ শয্যার হাসপাতাল চালুর পরও ৫ থেকে ১০ শতাংশ নির্মাণকাজ বাকি রয়েছে। রোগী ভর্তি নিয়ে সতর্ক অবস্থানে আছেন, কারণ অসম্পূর্ণ ভবনে রোগী রাখলে ঝুঁকি থাকতে পারে। তিনি আশা করছেন, এক মাসের মধ্যে পুরোপুরি চালু করা যাবে।
ইউনাইটেড হেলথকেয়ার সার্ভিসেসের সহযোগী পরিচালক ডা. আজমল কাদের চৌধুরী জানান, তারা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকেই প্রাধান্য দিচ্ছেন এবং ধাপে ধাপে কার্যক্রম বাড়াচ্ছেন। রোগীর সংখ্যা কম হলেও সেবার মান নিশ্চিত করার জন্য এটি করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
চিকিৎসা শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তদারকির অভাব এবং অনুমোদনের শর্তে ছাড় দেওয়ার প্রবণতা দেশের চিকিৎসা শিক্ষার মানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WFME) স্বীকৃতির জন্য মেডিকেল কলেজের মান উন্নয়ন অপরিহার্য, যেখানে শর্ত লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইউনাইটেড মেডিকেল কলেজের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম কেমন হবে তা সময়ই বলবে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঠিক তদারকি ছাড়া দেশের চিকিৎসা শিক্ষা কাঙ্ক্ষিত মানে পৌঁছাবে না—এটা স্পষ্ট।

