নাগরিক সেবা সহজ করতে প্রায় চার কোটি টাকা ব্যয়ে ‘সবার ঢাকা’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ বানিয়েছিল ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি)। তবে সেই অ্যাপ এখন করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণেই নেই। চাইলেও ডিএনসিসি অ্যাপটির নিয়ন্ত্রণ পাচ্ছে না। নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে একাধিকবার চিঠি দিলেও তারা কোনো সাড়া দেয়নি। এতে বিপাকে পড়েছে সিটি করপোরেশন।
গত ২৭ এপ্রিল মিরপুরে একটি প্রকল্প উদ্বোধনে গিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ। তিনি বলেন, “আমাদের একটা অ্যাপ আছে কিন্তু পাসওয়ার্ড দিচ্ছে না। আগে যারা ক্ষমতায় ছিলেন, তারা চার কোটি টাকা খরচ করে এটি বানিয়েছেন। এখন পাসওয়ার্ড না দিলে আমরা আইনি ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হব।”
প্রকল্পটি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে খরচ নিয়েও। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এমন একটি অ্যাপ তৈরিতে সর্বোচ্চ ১২ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। অথচ এখানে দেখানো হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা, যা প্রকৃত ব্যয়ের তুলনায় ৩০ গুণ বেশি। এত খরচ করেও ডিএনসিসির হাতে নেই কোনো নিয়ন্ত্রণ।
জানা গেছে, ২০২০ সালের অক্টোবরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কোম্পানি (আইআইএফসি)-র সঙ্গে সরাসরি চুক্তি করে ডিএনসিসি। এরপর আইআইএফসি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয় ওয়ালেট মিক্স নামের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০২১ সালের ৭ অক্টোবর। কিন্তু এখনো অ্যাপটি হস্তান্তর করা হয়নি।
ডিএনসিসির আইসিটি বিভাগ জানায়, কারিগরি কাজ করেছে ওয়ালেট মিক্স। তাদের সঙ্গে আইআইএফসির চুক্তি হয় ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর। অথচ তার আগে, ১০ জানুয়ারি অ্যাপটির উদ্বোধন হয়ে যায়। উদ্বোধনে উপস্থিত ছিলেন তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম। কর্মকর্তাদের মতে, এটি ছিল লোক দেখানো চুক্তি। কাজ শুরু হওয়ার আগেই উদ্বোধন, আর চুক্তির সময়ের গরমিল প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ওয়ালেট মিক্স নামেও তৈরি হয়েছে সন্দেহ। নিকুঞ্জ-২ এলাকায় প্রতিষ্ঠানটির অফিসে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ডিএনসিসিও জানে না প্রতিষ্ঠানটি এখন কোথায় আছে।
অ্যাপ বুঝে না পাওয়ায় ২৪ এপ্রিল আইআইএফসি বরাবর চিঠি পাঠায় ডিএনসিসি। এতে ২৭ এপ্রিলের মধ্যে অ্যাপ হস্তান্তরের অনুরোধ জানানো হয়। চিঠিতে স্বাক্ষর করেন আইসিটি বিভাগের সিস্টেম অ্যানালিস্ট প্রকৌশলী আবুল হাসনাত মোহাম্মদ আশরাফুল আলম। তিনি বলেন, ওয়ালেট মিক্স চুক্তিভঙ্গ করেছে। তারা নির্ধারিত সময়ে অ্যাপ হস্তান্তর করেনি। এখন দিতে গড়িমসি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড লাইসেন্সও বাতিল করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আইআইএফসির অতিরিক্ত পরিচালক মুন্সি শহীদ আনিস দাবি করেন, ২০২৩ সালেই অ্যাপটি ডিএনসিসিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে সময় ডিএনসিসির নিজস্ব প্রযুক্তি টিম না থাকায় সহায়তা করেছিল ওয়ালেট মিক্স। তিনি জানান, ২৯ ও ৩০ এপ্রিল অ্যাপ সংক্রান্ত কারিগরি তথ্য পাঠানো হয়েছে।
তবে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত ডিএনসিসি অ্যাপের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই গেছে। কর্মকর্তারা এখনো স্পষ্ট করে কিছু বলতে পারছেন না।
অ্যাপের খরচ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই ধরনের অ্যাপের সার্ভার ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে। বছরে যা ১৮ লাখ টাকার মতো। অথচ এই প্রকল্পে দেখানো হয়েছে ৩ কোটি ৭১ লাখ টাকা খরচ।
এ পর্যন্ত গুগল প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপটি ডাউনলোড হয়েছে ৫১ হাজার বার। তবে সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা ডিএনসিসির আইসিটি বিভাগও জানে না।
কয়েকটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করে জানা গেছে, এমন একটি অ্যাপ বানাতে গড়ে ১০ লাখ টাকা খরচ হতে পারে। টেক জেনিথের স্বত্বাধিকারী মিয়াদ হোসেন বলেন, “সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা লাগার কথা।” নিবসিস লিমিটেডের প্রকৌশলী শেখ ফয়সাল হোসেন বলেন, “দুই-তিনজন ডেভেলপারের তিন মাসের কাজ, খরচ ৬-৭ লাখ টাকার মধ্যে।”
সব মিলিয়ে প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয়, হস্তান্তর না হওয়া এবং স্বচ্ছতার অভাব আবারও নগর প্রশাসনের দুর্বলতা, জবাবদিহির সংকট আর রাজনৈতিক প্রভাবের বিষয়গুলো সামনে এনেছে। প্রশ্ন উঠেছে, এমন প্রকল্প আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করে, আর এর দায় নেবে কে?

