বেসরকারি এয়ারলাইন্স নভোএয়ার গত ২ মে ফ্লাইট পরিচালনা সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে। বেশ কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের চাপের মুখে থাকা এই এয়ারলাইন্সটি বেসরকারি বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)কে মৌখিকভাবে জানায় যে, তারা দুই সপ্তাহের জন্য ফ্লাইট বন্ধ রাখবে তবে এর পরেও তাদের অপারেশনে ফিরতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ বাংলাদেশে ইতিহাসে এমন কোনো এয়ারলাইন্স নেই যা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে আবার ফিরে এসেছে।
বাংলাদেশে বেসরকারি এয়ারলাইন্স বন্ধ হওয়ার ঘটনা একেবারেই নতুন নয়। গত ২৬ বছরে দেশে মোট ১০টি যাত্রীবাহী এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে গেছে এবং কোনো বেসরকারি এয়ারলাইন্সই ১৩-১৪ বছরের বেশি টিকে থাকতে পারেনি। ১৯৯৫ সালে ‘অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’ বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইন্স হিসেবে অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করে তবে অতিরিক্ত ল্যান্ডিং এবং পার্কিং চার্জের কারণে চার বছরের মধ্যেই তাদের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর ১৯৯৭ সালে ‘এয়ার পারাবত’ ফ্লাইট পরিচালনা শুরু করলেও ২০০১ সালে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। ২০০৭ সালে ‘বেস্ট এয়ার’ এবং ‘এয়ার বাংলাদেশ’ ও ‘রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইন্স’ চালু হয় কিন্তু অব্যাহত লোকসানের কারণে এগুলিও বন্ধ হয়ে যায়।
বেসরকারি এয়ারলাইন্সগুলোর মালিকদের দাবি, বেবিচকের বকেয়া পাওনার ওপর অতিরিক্ত সারচার্জ আরোপের কারণে অনেক এয়ারলাইন্স দেনা শোধ করতে পারছে না, ফলে তারা দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে বেবিচকের কাছে বকেয়া পরিশোধ করতে হলে প্রতি মাসে ৬ শতাংশ হারে সারচার্জ দিতে হয় যার ফলে বছরে মোট সারচার্জ দাঁড়ায় ৭২ শতাংশ। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ওমান এবং ভারতসহ বিভিন্ন দেশের সিভিল এভিয়েশন অথরিটিগুলো বেবিচকের তুলনায় অনেক কম সারচার্জ আরোপ করে থাকে।
২০১৬ সালে ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের কাছে বেবিচকের পাওনা ছিল ৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু সারচার্জের কারণে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৫৫ কোটি টাকায়। ইউনাইটেড এয়ারওয়েজের চেষ্টা সত্ত্বেও সারচার্জের কারণে তারা আবার অপারেশনে ফিরতে পারেনি। ২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট শুরু করা জিএমজি এয়ারলাইন্স ২০১২ সালে বন্ধ হয়ে যায় এবং ২০১৩ সালে ফিরে আসার ঘোষণা দিয়েও তা আর ফিরে আসেনি। এরও আগে, ২০২০ সালের মার্চে করোনার প্রথম ঢেউয়ের সময় রিজেন্ট এয়ারওয়েজের কাছে বেবিচকের পাওনা ছিল ২৮৩ কোটি টাকা কিন্তু ঋণের চাপে তারা আর ফেরেনি।
এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্ধ হয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সগুলো বেশ প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং তাদের বন্ধ হয়ে যাওয়ার মূল কারণ হিসেবে বেবিচকের অত্যধিক সারচার্জ এবং অন্যান্য খরচগুলোকে দায়ী করা হচ্ছে। তারা মনে করছেন, বেবিচকের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জানার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কেন একের পর এক ব্যবসা সফল এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
এয়ারলাইন্সের মালিকরা জানান, বাংলাদেশের জেট ফুয়েলের দামও অত্যধিক বেশি। বর্তমানে, দেশীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে প্রতি লিটার জেট ফুয়েল কিনতে হচ্ছে দশমিক ৭৫ মার্কিন ডলারে, তবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরবের মতো দেশগুলিতে একই জেট ফুয়েল এর দাম অনেক কম।
এয়ার অ্যাস্ট্রার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইমরান আসিফ বলেন, “বাংলাদেশে জেট ফুয়েলের দাম পৃথিবীর যেকোনো দেশের চেয়ে ৪০ শতাংশ বেশি, আর সারচার্জও অতিরিক্ত। তাই, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে।” তিনি আরও বলেন, “এমনকি একটি বড় এয়ারলাইন্সও ১৪-১৫ বছরের বেশি টিকতে পারছে না।”
এয়ারলাইন্সগুলো আরও অভিযোগ করে যে, ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দেশি-বিদেশি এয়ারলাইন্সের ল্যান্ডিং-পার্কিং চার্জও অত্যধিক। একটি বোয়িং ৭৩৭-৮০০ মডেলের প্লেন ঢাকায় অবতরণ করলে ১৫৪০ মার্কিন ডলার এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাট দিতে হয়, যা প্রায় ২ লাখ ২২ হাজার টাকা। অথচ মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে একই প্লেনের জন্য মাত্র ১৫ হাজার ৫৩৭ টাকা ল্যান্ডিং চার্জ দিতে হয়।
এছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং চার্জও বাংলাদেশের অন্যান্য বিমানবন্দরগুলোর তুলনায় অনেক বেশি।
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম বলেন, “এয়ারলাইন্সগুলো পার্শ্ববর্তী দেশগুলির তুলনায় অতিরিক্ত জেট ফুয়েলের দাম বিমানবন্দরের উচ্চ চার্জ এবং সারচার্জের কারণে লোকসানে পড়ছে এবং বেশিরভাগ এয়ারলাইন্স বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”
অতএব, এসব সমস্যার সমাধান করতে সরকারকে প্রয়োজনীয় নীতিমালায় পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়েছেন এভিয়েশন বিশেষজ্ঞরা।

