ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার সিলোনিয়া বাজারে সাউথইস্ট ব্যাংকের একটি শাখা থেকে ‘কয়েক কোটি টাকা’ নিয়ে ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা উধাও হয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা একে একে ব্যাংকে হাজির হয়ে বিক্ষোভ করছেন। ইতোমধ্যে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে।
অভিযুক্ত ব্যাংক কর্মকর্তা হলেন মোহাম্মদ জিয়াউল হক। তিনি ওই শাখার জুনিয়র কর্মকর্তা হিসেবে রেমিটেন্স ডেস্কে সাত বছর ধরে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তার বাড়ি জেলার ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠান নগর ইউনিয়নের পশ্চিম ফতেহনগর এলাকায়, তিনি সালমান হাজী বাড়ির আবদুল হকের ছেলে। সিলোনিয়া বাজারে ২০১৮ সালে ব্যাংকটির এই শাখা চালু হয় এবং শুরু থেকেই জিয়াউল সেখানে কর্মরত ছিলেন। শাখাটি ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়কের পাশে হওয়ায় অল্প সময়ে এটি গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করে। দীর্ঘদিন একই শাখায় কাজ করায় জিয়াউল স্থানীয় গ্রাহকদের সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, সেই আস্থাকে কাজে লাগিয়েই তিনি আমানতের টাকা সরিয়ে নিয়েছেন।
শাখা ব্যবস্থাপক মো. কামরুজ্জামান জানান, গ্রাহকদের হিসাব থেকে অর্থ লোপাটের খবর পাওয়ার পর বিষয়টি ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাংকের অডিট বিভাগ থেকে একটি দল এসে তদন্ত শুরু করেছে এবং তথ্য সংগ্রহ করছে। তিনি বলেন, “কতজন গ্রাহকের অ্যাকাউন্ট থেকে কী পরিমাণ অর্থ সরানো হয়েছে, তা চূড়ান্তভাবে বলা যাবে অডিট শেষ হওয়ার পর।”
বিভিন্ন মেয়াদী আমানতের অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জানাজানি হওয়ার পর গ্রাহকরা একে একে ব্যাংকে উপস্থিত হয়ে হৈ-হুল্লোড় শুরু করেন। কেউ কেউ নিজেদের হিসাবের স্থিতি জানতে আসেন। এ সময় অভিযোগ ওঠে, ব্যাংকের নিরাপত্তাকর্মী জয়নাল আবেদীনকে ধাক্কা দিয়ে জিয়াউল হক শাখা থেকে পালিয়ে যান। এরপর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এবং ব্যাংকের কোনো কর্মকর্তা তার অবস্থান জানাতে পারেননি।
ব্যাংকের একাধিক গ্রাহক এই ঘটনায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী ইমরান হোসেন বলেন, “৩০ এপ্রিল আমার অ্যাকাউন্ট থেকে ৫০ লাখ টাকা লোপাট হয়েছে। এরপর আমি ১ মে ব্যাংক ম্যানেজারকে ফোন করে বিস্তারিত জানাই। প্রাথমিকভাবে জানা যায়, এ ঘটনার সঙ্গে জিয়াউল জড়িত।”
একই অভিযোগ করেন দাগনভূঞা উপজেলার জায়লস্কর ইউনিয়নের সোনাপুর গ্রামের ব্যবসায়ী এ কে আজাদ। তার হিসাব থেকে ৩২ লাখ টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। তিনি জানান, আরটিজিএসের মাধ্যমে লেনদেন করেছিলেন এবং তার ধারণা, স্বাক্ষর জাল করে জিয়াউল হক এই অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
স্থানীয় এক ট্রাভেল ব্যবসায়ীও তার ১০ লাখ টাকা তছরুপের অভিযোগ এনেছেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো আরটিজিএস লেনদেন করিনি, চেক হারায়ওনি। তারপরও কীভাবে টাকা গায়েব হলো, বুঝতে পারছি না। বিষয়টি ম্যানেজারকে জানিয়েছি।”
এছাড়া প্রবাসী শফি উল্লার স্ত্রী জোসনা বেগম জানান, তার স্বামী বিদেশ থেকে ১৬ লাখ টাকা পাঠিয়েছেন এই ব্যাংক শাখার মাধ্যমে। এখন তিনি শাখায় গিয়ে টাকাটি তুলতে পারছেন না, জিয়াউল হকের পালিয়ে যাওয়ার খবর শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ব্যাংক তাকে ধৈর্য ধরতে বলেছে।
রোববার ব্যাংকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের অডিট টিম ঘটনাস্থলে তদন্তে যায়। পাঁচ সদস্যের এই দলের নেতৃত্ব দেন অ্যাসিস্ট্যান্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট রেজাউল কবির। তদন্ত চলাকালে জিয়াউল হক হঠাৎ করেই নিরাপত্তাকর্মীকে ধাক্কা দিয়ে পালিয়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য।
এ বিষয়ে জানতে জিয়াউল হকের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে। তার অবস্থান সম্পর্কেও কেউ নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।
সাউথইস্ট ব্যাংক লিমিটেডের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রহমান চৌধুরী বলেন, “বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে অডিট কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর বিস্তারিত বলা যাবে।” তিনি আরও বলেন, “গ্রাহকদের অর্থের দায়ভার ব্যাংক বহন করবে। তাই আতঙ্কের কিছু নেই। দ্রুত এই সমস্যার সমাধান হবে।”
ব্যাংক কর্মকর্তার এমন আচরণে গ্রাহকরা যেমন হতবাক তেমনি ক্ষতির আশঙ্কায় দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। তারা দ্রুত যথাযথ তদন্ত ও অর্থ ফেরতের নিশ্চয়তা দাবি করছেন।

