চট্টগ্রামের দক্ষিণ পতেঙ্গা ওয়ার্ডের নাজিরপাড়া এলাকায় বসবাস মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের। তাঁর বাড়ির ছাদে দাঁড়ালে চোখে পড়ে বিস্তৃত সমুদ্র। অথচ সেই পানির রাজ্যেও তাঁর পরিবারের জন্য এক গ্লাস খাওয়ার পানি জোগাড় করাই দুঃসাধ্য। ওয়াসার কোনো সংযোগ নেই তাঁদের বাড়িতে। আগে বাড়ির পাশে পুকুর ছিল যা এখন ভরাট। একটি নলকূপ থাকলেও তা থেকে আর পানি ওঠে না। ওয়াসার কাছে বারবার অনুরোধ করেও কোনো সাড়া মেলেনি। এখন বাজার থেকে পানি কিনে রান্নাবান্না ও দৈনন্দিন কাজ সারতে হয় পরিবারটিকে।
নাজিরপাড়ায় শুধু সাইফুলের পরিবারই নয় গোটা এলাকাই ভুগছে তীব্র পানিসংকটে। এই দুর্ভোগ দীর্ঘদিনের। অথচ গত দেড় দশকে চট্টগ্রাম ওয়াসা ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয়ে আটটি ছোট-বড় পানি সরবরাহ প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। তারপরও শুধু নাজিরপাড়া নয়, নগরীর আরও শতাধিক এলাকায় আজও ওয়াসার কোনো সংযোগ পৌঁছায়নি। এতে অন্তত ১২ লাখ মানুষ প্রতিদিন তীব্র পানির সংকটে দিন পার করছেন।
চট্টগ্রাম ওয়াসার নথি অনুযায়ী, সংস্থাটি ১৯৬৩ সালে মাত্র তিনটি গভীর নলকূপ দিয়ে পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু করে। পেরিয়ে গেছে ৬২ বছর। অথচ এখনো প্রতিষ্ঠানটির কাছে নেই নগরের পানি চাহিদা সংক্রান্ত একটি পূর্ণাঙ্গ মহাপরিকল্পনা বা মাস্টারপ্ল্যান। আগামী ২০ বা ৩০ বছরে চাহিদা কত হবে কোথায় তা বেশি বাড়বে কিভাবে সেই চাহিদা পূরণ করা হবে এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের কোনো নির্ভরযোগ্য উত্তর নেই ওয়াসার কাছে।
ওয়াসার এক অভ্যন্তরীণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে চট্টগ্রাম শহরে দৈনিক পানির চাহিদা ৫৬ কোটি লিটার। এর বিপরীতে উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ৫০ কোটি লিটারের। গ্রাহক সংযোগ রয়েছে ৯৮ হাজারটি। এই হিসাবে দেখা যায়, নগরবাসীর ৬৫ শতাংশের হাতে পৌঁছে ওয়াসার পানি। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় জনসংখ্যা ৩২ লাখ ৩০ হাজার ৫০৭ জন। এ তথ্য ধরে হিসাব করলে দেখা যায়, অন্তত ১১ লাখ ৩০ হাজার মানুষ ওয়াসার পানি সুবিধার বাইরে। আর সিটি করপোরেশনের নিজস্ব হিসাবে চট্টগ্রামে জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লাখ। সে হিসেবে ২১ লাখের বেশি মানুষ পানির সেবার আওতায় নেই।
ওয়াসার সূত্র জানায়, সিটি করপোরেশনের ১, ২, ১০, ১১, ১৮ এবং ৩৭ থেকে ৪১ নম্বর ওয়ার্ডে পানির সংকট সবচেয়ে প্রকট। এসব এলাকায় এখনও কোনো ওয়াসার সংযোগ নেই। ফলে বাসিন্দাদের ভরসা এখন গভীর নলকূপ, কেনা পানি, পুকুর কিংবা স্থানীয় জলাশয়।
এই সংকটের বাস্তবতা স্বীকার করেছেন ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম। তিনি জানান, একসময় ওয়াসার দৈনিক উৎপাদন ছিল মাত্র ১০ কোটি লিটার। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ কোটি লিটারে। তবে এখনও অনেক এলাকায় পানি সরবরাহ করা যাচ্ছে না। এজন্য একটি পূর্ণাঙ্গ মহাপরিকল্পনা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এই মাস্টারপ্ল্যানে কোন এলাকায় সংকট বেশি ভবিষ্যতে কতটুকু পানি প্রয়োজন হবে, কয়টি নতুন শোধনাগার নির্মাণ করতে হবে তা বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হবে।
তবে আশঙ্কার বিষয় হলো, এতদিন কোনো মাস্টারপ্ল্যান ছাড়াই একের পর এক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে গেছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। প্রথম পানি শোধনাগার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয় ১৯৮৭ সালে। এরপর দীর্ঘ ২২ বছর কোনো বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়নি। ২০০৯ সাল থেকে গত ১৫ বছরে বাস্তবায়ন হয় আটটি বড় প্রকল্প যার মোট ব্যয় ৮ হাজার ৮০০ কোটি টাকার বেশি।
নথি অনুযায়ী, এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে চারটি ছিল সবচেয়ে বড়। সেগুলো হলো ১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (প্রথম পর্যায়), ১ হাজার ৮৯০ কোটি টাকায় চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ উন্নয়ন ও পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প, ৩ হাজার ৮২ কোটি টাকার কর্ণফুলী পানি সরবরাহ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়) এবং ১ হাজার ৯৯৪ কোটি টাকার ভান্ডালজুরী পানি সরবরাহ প্রকল্প। বড় প্রকল্পগুলোর নির্ধারিত সময় মেনে শেষ করা সম্ভব হয়নি। প্রায় সব প্রকল্পেই একাধিকবার সময় ও ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান মনে করেন, এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য জরুরি ভিত্তিতে একটি সুসংগঠিত ও বাস্তবমুখী মহাপরিকল্পনা তৈরি করা উচিত। তাঁর মতে, নগরের জনসংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে, বাড়ছে পানির চাহিদা। অনেক এলাকায় এখনও পাইপলাইন বসেনি। আবার যেসব এলাকায় রয়েছে সেখানেও নিয়মিত পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। তাই এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেতে হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে এগোতে হবে।
চট্টগ্রামের পানিসংকট এখন আর শুধু অব্যবস্থাপনার বিষয় নয় বরং এটি নগরের জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ ও জীবনমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। তাই প্রকল্পের সংখ্যা বাড়ানো নয় প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, সুষ্ঠু বাস্তবায়ন এবং সবার জন্য নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা।

