রাজধানী ঘিরে গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে চলছে ভয়ংকর রিফুয়েলিং বাণিজ্য। যানবাহনের বদলে এখন স্টেশনগুলোর অগ্রাধিকার পাচ্ছে সিলিন্ডারবাহী ভ্যান ও ট্রাক। এসব যানেই সিলিন্ডার ভরে সরবরাহ করা হচ্ছে শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনায়।
সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়িগুলো দীর্ঘ লাইন দিয়েও গ্যাস পাচ্ছে না। বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। অথচ ঠিক সেই সময়েই সিলিন্ডার ভরে বিক্রি করা হচ্ছে বেশি দামে। বর্তমান সরকারি দরে সিএনজির প্রতি ঘনমিটার দাম ৪৩ টাকা হলেও এসব সিলিন্ডারে তা বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকায়।
সিলিন্ডার মানেই চলন্ত বোমা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে উচ্চচাপে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা অত্যন্ত বিপজ্জনক। একে বলা যায় ‘চলন্ত বোমা’। আগে এসব কাজ হতো গোপনে। এখন চলছে প্রকাশ্যে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে বহুগুণ।
কনজিউমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, অবৈধভাবে গ্যাস রিফিল বন্ধ করতে হবে এখনই। নয়তো বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে।
স্টেশনেই প্রকাশ্য রিফুয়েলিং
গত রবিবার গাজীপুরের তালুকদার, খান ও কেআরসি সিএনজি স্টেশনে দেখা গেছে, একাধিক কাভার্ড ভ্যানে গ্যাস ভরা হচ্ছে। অন্যদিকে সাধারণ গাড়ির চালকরা দীর্ঘ সময় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেক চালক জানালেন, তারা রোজই হয়রানির শিকার হন। গ্যাস দেওয়ার নামে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। শেষমেশ ফিরেও যেতে হয় খালি হাতে।
স্টেশনের ম্যানেজাররা বলছেন, শিল্পকারখানার চাহিদা পূরণে তারা গ্যাস সরবরাহ করছেন। যদিও এসব গ্যাস বিক্রি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ অবৈধ।
সাভার-আশুলিয়াতেও একই অবস্থা
সাভার, বাইপাইল, জিরাবো, পুকুরপার—সবখানেই একই চিত্র। দিনের আলোতেই সিলিন্ডার ভরে গ্যাস পাঠানো হচ্ছে বিভিন্ন কারখানায়। অনেকে জানালেন, পাইপলাইনে গ্যাস সংকট থাকায় তারা স্টেশন থেকেই গ্যাস নিচ্ছেন। এটি এখন তাদের একমাত্র ভরসা।
টিএস সিএনজি রিফুয়েলিংয়ের ম্যানেজার আসাদুজ্জামান বলেন, প্রায় সব পাম্পেই এই ধরনের গ্যাস বিক্রি চলছে। এতে ঝুঁকি থাকলেও চাহিদার কারণে বন্ধ করা যাচ্ছে না।
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের হুঁশিয়ারি
বিস্ফোরক অধিদপ্তরের উপপ্রধান পরিদর্শক ফরিদ উদ্দীন জানান, উচ্চচাপে সিলিন্ডারে গ্যাস ভরা অত্যন্ত বিপজ্জনক। গাজীপুর, নরসিংদী ও চট্টগ্রামে এমন ঘটনা বেশি ঘটছে। খুব শিগগিরই অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিইআরসির কড়া অবস্থান
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, সিএনজি স্টেশনগুলোকে কেবল যানবাহনে গ্যাস সরবরাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সিলিন্ডারে গ্যাস ভরে বিক্রি করা সম্পূর্ণ অবৈধ। আমরা বিষয়টি নিয়ে কঠোর অবস্থানে আছি। অপরাধী স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে লাইসেন্স বাতিলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গ্যাস সঙ্কটে ভুগছে পুরো দেশ। সেই সময়ে এই অবৈধ রিফুয়েলিং বাণিজ্য শুধু আইনের লঙ্ঘন নয়, মানুষের জীবনের জন্য বড় ঝুঁকি। যদি এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে যে কোনো সময় ঘটতে পারে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। এই ব্যবসা থামাতে হলে দরকার সমন্বিত নজরদারি, আইন প্রয়োগ ও দায়ীদের কঠিন শাস্তি।

