রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশানে মসজিদে গাউসুল আজমের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া গুলশান লেকের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে ভরাট করে গড়ে তোলা হয়েছে পার্কিং ব্যবসা। প্রভাবশালী একটি চক্র দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে এই লেক দখল করে আসছে। চক্রটি এখন সেখানে গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য জায়গা ভাড়া দিয়ে বছরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা আয় করছে।
সম্প্রতি লেকের নতুন একটি অংশে ইট, বালু ও মাটি ফেলে আরও দখলের চেষ্টা করলে পরিবেশ অধিদপ্তর তাতে হস্তক্ষেপ করে। ভরাট কার্যক্রম তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়। এর জেরে কাদেরিয়া পাবলিকেশন্স অ্যান্ড প্রোডাক্টস লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠান পরিবেশ অধিদপ্তরের কাছে লিখিতভাবে অঙ্গীকার করে যে, তারা আর লেক ভরাট করবে না।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) জানায়, ২০০৯ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি ধাপে ধাপে লেকের জমি ভরাট করে আসছে। বিষয়টি নতুন করে তাদের নজরে আসায় সম্প্রতি আবারও দখল ঠেকাতে পদক্ষেপ নেয়া হয়। যদিও কাদেরিয়া পাবলিকেশন্স অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, তারা নতুন করে কোনো ভরাট করেনি এবং রাজউকের সঙ্গে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, বর্তমানে এলাকায় কোনো নির্মাণ বা ভরাট কার্যক্রম চলছে না।
তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও বিভিন্ন সূত্র বলছে ভিন্ন কথা। কাদেরিয়া পাবলিকেশন্স লেকের জায়গা দখল করে সেখানে গাড়ি পার্কিং ব্যবসা করছে। বর্তমানে সেখানে প্রায় ৫০টি গাড়ি নিয়মিত রাখা হয়। এর মধ্যে বড় যানবাহনের মাসিক ভাড়া ৮,৫০০ টাকা এবং প্রাইভেটকারের ভাড়া ৫,৫০০ টাকা।

এ এলাকার একজন প্রহরী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, তিনি পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে সেখানে কাজ করছেন এবং এ সময়ে প্রতি বছরই একটু একটু করে মাটি ফেলে জায়গাটি বড় করা হয়েছে। আগে যেখানে ১৫-২০টি গাড়ি রাখা হতো এখন নিয়মিত প্রায় ৫০টি গাড়ি রাখা হচ্ছে।
গত ৮ মে সরেজমিনে গুলশান লেকের মসজিদে গাউসুল আজম সংলগ্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কাদেরিয়া পাবলিকেশন্স তাদের বাউন্ডারির বাইরের একটি বড় লেক অংশ ভরাট করে পার্কিংয়ে রূপান্তর করেছে। এছাড়া বীর উত্তম এ কে খন্দকার সড়কের পাশের নতুন অংশেও মাটি ফেলে ভরাট চলছে। পুরনো ভরাট অংশের সঙ্গে যুক্ত করে সেখানে ইট, বালু ও সুরকি ফেলা হচ্ছে।
তবে এসব জমি ২০২২ সালের রাজউকের গেজেট অনুযায়ী ‘ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান’ বা ড্যাপে জলাধার হিসেবে চিহ্নিত। অর্থাৎ এসব এলাকায় কোনোভাবেই ভরাট বা স্থাপনা নির্মাণ বৈধ নয়।
গুগল আর্থের ছবি বিশ্লেষণেও লেক দখলের প্রমাণ মেলে। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত মসজিদের সীমানার বাইরে লেক ভরাটের কোনো চিহ্ন নেই। কিন্তু ২০০৯ সাল থেকে মাটি ফেলে ভরাট শুরু হয় এবং ২০১০-১১ সালে তা আরও জোরদার হয়। ২০১১ সালের ছবিতে দেখা যায়, প্রায় ১২০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩০ মিটার প্রস্থের অংশ দখল করা হয়েছে। এরপরও ধাপে ধাপে আরও জায়গা ভরাট করে প্রতিষ্ঠানটি। বর্তমানে প্রায় ২০০ মিটার দীর্ঘ এবং প্রায় ১.৩ একর জলাধার ইতোমধ্যে ভরাট করা হয়েছে।
দীর্ঘদিনের স্থানীয় বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, তিনি ২৫ বছর ধরে এ এলাকায় বসবাস করছেন এবং নিজের চোখে দেখেছেন কীভাবে লেক ধীরে ধীরে ভরাট হচ্ছে। তার ভাষায়, “মসজিদ কর্তৃপক্ষ এমনভাবে দেওয়াল ও টিনের প্রাচীর দিয়েছে যে রাস্তা কিংবা বাইরে থেকে বোঝা যায় না ভিতরে কী হচ্ছে। কিন্তু নৌকায় করে গেলে দেখা যায় ভেতরে কীভাবে মাটি ফেলে লেক ভরাট করা হচ্ছে।”
তবে কাদেরিয়া পাবলিকেশন্স এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা তাদের নিজস্ব জমিতে মাটি ফেলেছে এবং পার্কিংয়ের ব্যবস্থাও নিজেদের জমিতেই করেছে। প্রতিষ্ঠানটির জেনারেল ম্যানেজার মো. রবিউজ্জামান বলেন, “যেখানে এখন গুলশান লেক বলা হচ্ছে সেখানে আগে ধান চাষ হতো। সেই জমি আমাদের নিজস্ব সেখানেই আমরা মাটি ফেলেছি। নতুন করে লেকের মধ্যে কোনো ভরাট হয়নি। রাজউক ও পরিবেশ অধিদপ্তরের সঙ্গে আমাদের বিষয়টি মীমাংসিত।”
তবে রাজউকের বাস্তবায়ন বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম ভিন্ন মত দিয়েছেন। তিনি বলেন, “তাদের লেক ভরাটের বিষয়টি জানার পর আমরা পরিবেশ অধিদপ্তরের মাধ্যমে কাজ বন্ধ করিয়েছি। পাশাপাশি তাদের মুচলেকা দিতে বলা হয়েছে। এই সপ্তাহের মধ্যে তা না দিলে আমরা মামলা করব। জলাধার আইন অনুযায়ী, নিজের জমিতেও জলাধার থাকলে সেটি ভরাট করা যাবে না।”
তিনি আরও জানান, এর আগেও কাদেরিয়াকে একাধিকবার নোটিশ দিয়ে সতর্ক করা হয়েছে কিন্তু তারা মানেনি। এবার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের মে মাসে গুলশান লেক ভরাটের অভিযোগে কাদেরিয়া পাবলিকেশন্সের মালিক এ এম এম বাহাউদ্দিনকে হাইকোর্ট তলব করে এবং এক মাসের জন্য ভরাট বন্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এছাড়া গত বছরের ২১ অক্টোবরও গুলশান-মহাখালী সংযোগ সড়কের কালভার্ট সংলগ্ন অংশে লেক ভরাটের চেষ্টা বন্ধ করে দেয় পরিবেশ অধিদপ্তর।
এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, গুলশান লেক রক্ষায় কর্তৃপক্ষ সময় সময় ব্যবস্থা নিলেও প্রভাবশালী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর ও টেকসই পদক্ষেপ এখনও অনিশ্চিত। জলাধার রক্ষা ও নগর পরিকল্পনার সুষ্ঠু বাস্তবায়নের জন্য এই অবৈধ দখল বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

