২০২৪ সালের জুলাই থেকে আগস্ট পর্যন্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তে নতুন গতি এনেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এ সময়ের মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়োজিত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তালিকা চেয়ে জেলা প্রশাসকদের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে সংস্থাটি। তদন্তের স্বার্থে শহিদ ও আহতদের তথ্য সংগ্রহ নিশ্চিত করতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তারা।
ঢাকা, কুমিল্লা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলার ডিসিদের কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্ধারিত ছক অনুযায়ী ওই সময় দায়িত্ব পালনকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নাম, মোবাইল নম্বর, ঘটনাস্থলের থানা, তারিখ, সময় এবং সহকারী বাহিনীর ধরন (যেমন: পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী) উল্লেখ করে তালিকা পাঠাতে অনুরোধ করা হয়েছে। চিঠিটি গত ৬ এপ্রিল তদন্ত সংস্থার উপসহকারী পরিচালক আহমেদ নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ স্বাক্ষর করে সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডায়েরি নম্বর ১৫৫ (২৭/১১/২৪), ০৪ (০১/০১/২৫), ২৮ (০৩/১০/২৫), ১০৯ (০৪/১১/২৪), ১৫৯ (০৩/১২/২৪), ১১০ (০৭/১১/২৪) অনুসারে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত চলছে। যেহেতু এসব মামলা জনগুরুত্বপূর্ণ, আলোচিত এবং জাতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংশ্লিষ্ট, তাই তদন্তের স্বার্থে ওই সময় নিয়োজিত ম্যাজিস্ট্রেটদের তথ্য দ্রুত সরবরাহ প্রয়োজন।”
তদন্ত সংস্থার উপসহকারী পরিচালক আহমেদ নাসির উদ্দিন মোহাম্মদ জানান, যেসব এলাকায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেসব এলাকার তথ্য সংগ্রহে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তিনি বলেন, “মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমরা জেলা প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরে তথ্য চেয়েছি। পাশাপাশি আমরা সরাসরি ঘটনাস্থলে গিয়েও তথ্য সংগ্রহ করছি। জুলাই আন্দোলনের প্রকৃত চিত্র জানতে ম্যাজিস্ট্রেটদের তালিকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে তারা সাক্ষী হিসেবেও বিবেচিত হতে পারেন। ইতোমধ্যে কিছু জেলা থেকে তথ্য আসতে শুরু করেছে।”
এই উদ্যোগকে সময়োপযোগী ও আইনসিদ্ধ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “আমি মনে করি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কার নির্দেশে ওই সময় এমন মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তা নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকা জরুরি। সেই সময় কারা দায়িত্বে ছিলেন তদন্ত সংস্থা তা যাচাই করবে।”
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলা আন্দোলনে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার থেকে শুরু করে এক দফা সরকার পতনের আন্দোলন গড়ে ওঠে। মাত্র ৩৬ দিনের এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই স্বৈরতান্ত্রিক আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। আন্দোলনে ৮৭৫ জন নিহত হন যাদের অধিকাংশের মৃত্যু ঘটে গুলিবিদ্ধ হয়ে। আহত হন আরও ৩০ হাজারের বেশি মানুষ।
আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত পালিয়ে যান এবং এরপর থেকে তিনি সেখানেই অবস্থান করছেন। এ আন্দোলনে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও সহিংসতার বিচার নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে। হাইকোর্টের বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারকে চেয়ারম্যান এবং বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরীকে সদস্য করে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। বিচার কাজ ত্বরান্বিত করতে সরকার গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনাল গঠন করে একটি প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
প্রসিকিউশনের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এখন পর্যন্ত মোট ৩৩০টি অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৯টি তদন্ত কার্যক্রম চলমান যেগুলো অভিযোগ নিবন্ধন পর্যায়ে রয়েছে। তদন্তের প্রাথমিক সত্যতার ভিত্তিতে ২২টি মামলাকে ‘মিস কেস’ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ১৪১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৫৪ জন গ্রেপ্তার এবং ৮৭ জন পলাতক। অভিযুক্তদের মধ্যে ৭০ জন বেসামরিক, ৬২ জন পুলিশ সদস্য এবং ৯ জন সামরিক বাহিনীর সদস্য বলে জানা গেছে।
তদন্ত সংস্থার তথ্য সংগ্রহ ও বিচার কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার এই উদ্যোগ আন্দোলন সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

