গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে ১৫৮টিরও বেশি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিপরীতে শত শত কোটি টাকার পরিশোধিত বিলসহ যাবতীয় নথিপত্র এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হাতে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রকল্প অনুমোদন এবং ভূয়া প্রকল্প দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে কমিশন।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) চেয়ারম্যানের কাছে এসব নথি তলব করেন দুদকের উপপরিচালক ও অনুসন্ধান দলের প্রধান মুহাম্মদ জয়নাল আবেদীন।
বিউবো জানিয়েছে, গত ৬ মে দুদকের অনুরোধে সব প্রয়োজনীয় নথিপত্র সরবরাহ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম বলেন, “আমরা দুদকের চিঠি পেয়েছি এবং তারা যেসব নথিপত্র চেয়েছে তা সরবরাহ করেছি। আমরা চাই, বিদ্যুৎ খাতে যেসব অনিয়ম হয়েছে তার সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং যারা দায়ী তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক।”
দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের তিন মেয়াদে বিদ্যুৎ খাতে বিপুল ব্যয় হয়েছে, যার পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৮৩০ কোটি ডলার বা প্রায় পৌনে ৪ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা শুধু ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ নামে বিতর্কিত পেমেন্ট খাতে ব্যয় হয়েছে। বিদ্যুৎ না কিনলেও উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখার নামে বছরে বছরের পর বছর অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে এই অর্থ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রগুলোর অধিকাংশই ব্যবহার হয়েছে মাত্র ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সক্ষমতায়, যদিও লাইসেন্সে বলা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ সক্ষমতায় এগুলো পরিচালিত হবে। বছরের প্রায় ৭০ থেকে ৭৫ ভাগ সময় এসব কেন্দ্র বন্ধ ছিল।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, উচ্চমূল্যে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে রেখে শুধুমাত্র ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা সরাসরি গিয়েছে সরকারঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী ও ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠদের পকেটে। এর বাইরে সরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে নিম্নমানের যন্ত্রাংশ ক্রয়, ভূমি অধিগ্রহণ ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে ভয়াবহ অনিয়ম ও লুটপাট হয়েছে।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলার জন্য আওয়ামী লীগ সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন নীতির আওতায় ৮টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র অনুমোদন দেয়, যেগুলো ছিল আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নেয়া উদ্যোগ। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার বিনা টেন্ডারে আরও ৩২টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র নির্মাণ করে। এসব প্রকল্পে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র পরিহারের জন্য ২০১০ সালে সংসদে বিশেষ এক আইন পাস করা হয় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন। প্রথমে এই আইন দুই বছরের জন্য পাস করা হলেও পরে তা একাধিকবার বাড়িয়ে ২০২৬ সাল পর্যন্ত বহাল রাখা হয়েছে।
এই আইনের আওতায় ৭২টি রেন্টাল ও আইপিপি (ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার) কেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়। এসব প্রকল্পের বড় অংশই পেয়েছেন তৎকালীন সরকারের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীরা। সামিট, ওরিয়ন, দেশ এনার্জি, ডরিন পাওয়ার, ইউনাইটেড, এনার্জিপ্যাকসহ বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী গ্রুপ বিনা টেন্ডারে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বরাদ্দ পেয়েছে।
সামিট গ্রুপের ৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পায় ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা, ইউনাইটেড গ্রুপ ৫টি কেন্দ্র পেয়ে নেয় ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। এছাড়া কনফিডেন্স গ্রুপ ৬টি কেন্দ্র পেয়ে পেয়েছে ৯৬২ কোটি টাকা, বাংলাক্যাটের ৪টি কেন্দ্র ৭৩৩ কোটি টাকা এবং ডরিন পাওয়ার ৬টি কেন্দ্র পেয়ে ৬৮০ কোটি টাকা গ্রহণ করে। দেশ এনার্জি পেয়েছে ৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্র, যার ভাড়া বাবদ সরকার পরিশোধ করে ৫১৫ কোটি টাকা।
ডরিন পাওয়ারের মালিক প্রয়াত ছাত্রলীগ নেতা নূরে আলম সিদ্দিকীর ছেলে তাহজীব আলম সিদ্দিকী, যিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ঝিনাইদহ থেকে দু’বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। আর দেশ এনার্জি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন প্রয়াত ঢাকা উত্তর সিটির মেয়র আনিসুল হক।
দুদক এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি, পাওয়ার পারচেজ এগ্রিমেন্ট, ইমপ্লিমেন্টেশন এগ্রিমেন্টসহ সব চুক্তির অনুলিপি, পরিশোধিত বিল, বকেয়া বিল ও প্রকল্প অনুমোদনের সব নথি তলব করেছে। ভারতের বাহারামপুর থেকে ১ হাজার মেগাওয়াট, ত্রিপুরা থেকে ১৬০ মেগাওয়াট এবং ঝাড়খণ্ডের আদানি পাওয়ার থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির নথিও দুদক সংগ্রহ করেছে।
২০০৯ সালে বিউবো ও আরইবির আওতায় ১২টি গ্যাসচালিত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়। এগুলো হলো- হবিগঞ্জ এসআইপিপি, শাহজীবাজার রেন্টাল, ফেনী এসআইপিপি, উল্লাপাড়া এসআইপিপি (সামিট), কুমারগাঁও রেন্টাল (দেশ এনার্জি), মহিপাল ফেনী এসআইপিপি, মাওনা গাজীপুর এসআইপিপি (সামিট), বাড়বকুণ্ড এসআইপিপি (রিজেন্ট), রূপগঞ্জ নারায়ণগঞ্জ এসআইপিপি (সামিট), জাঙ্গালিয়া কুমিল্লা এসআইপিপি (সামিট), ভোলা রেন্টাল (ভেঞ্চার) ও ফেঞ্চুগঞ্জ রেন্টাল।
২০১০ সালে অনুমোদিত ৯টি কেন্দ্র হলো- আশুগঞ্জ রেন্টাল (প্রিশিসান এনার্জি), শিকলবাহা রেন্টাল (এনার্জিস), ঠাকুরগাঁও রেন্টাল (আরজেড পাওয়ার), খুলনা কুইক রেন্টাল (এগ্রিকো), ঘোড়াশাল কুইক রেন্টাল (এগ্রিকো), শিকলবাহা ১৫০ মেগাওয়াট পিকিং, সিদ্ধিরগঞ্জ ১২০ মেগাওয়াট (২য় ইউনিট), পাগলা ৫০ মেগাওয়াট কুইক রেন্টাল (ডিপিএ) এবং ভেড়ামারা ১১০ মেগাওয়াট রেন্টাল (কোয়ান্টাম পাওয়ার)।
২০১১ সালে ২৩টি কেন্দ্র, ২০১২ সালে ১১টি, ২০১৩ সালে ৫টি এবং ২০১৪ সালে ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয় যেগুলোর প্রতিটির বিল ও চুক্তির নথি এখন দুদকের হাতে।
এই অনুসন্ধান প্রক্রিয়া বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের লুটপাট, অকার্যকর নীতিনির্ধারণ এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উন্মোচন করতে পারে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সংশ্লিষ্টতা, রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বরাদ্দ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে অদক্ষতার বাস্তব চিত্র তুলে আনছে এই তদন্ত। এখন দেখার বিষয়, দুদক এই অনুসন্ধান কতদূর নিয়ে যেতে পারে এবং আদৌ দোষীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় কিনা।

