পুঁজিবাজারে শেয়ারদরে কারসাজির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ২০ ব্যক্তি ও পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৫৫ কোটি টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে এই জরিমানা করা হয়। কমিশনের আদেশে বলা হয়েছে, জরিমানার অর্থ ৩০ দিনের মধ্যে জমা না দিলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
বিএসইসির এই শাস্তিমূলক সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ডিএসইর তিনটি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন সংক্রান্ত তদন্ত। প্রথমটি ছিল ২০২০ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এশিয়া ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনের কার্যক্রম। দ্বিতীয়টি ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮ অক্টোবর এবং ১ ডিসেম্বর থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সোনালী পেপার অ্যান্ড বোর্ড মিলস লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন সংক্রান্ত। তদন্তে দেখা যায়, এসব সময়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলো পুঁজিবাজারের নিয়ম লঙ্ঘন করে শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে লাভবান হওয়ার চেষ্টা করেছে।
তদন্তের ভিত্তিতে সরকারি কর্মকর্তা মো. আবুল খায়ের হিরুকে সবচেয়ে বেশি ৬ কোটি ৭৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তার স্ত্রী কাজী সাদিয়া হাসানকে জরিমানা করা হয়েছে ১২ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। হিরুর পিতা আবুল কালাম মাতবর, ভাই সাজিদ মাতবর, বোন কনিকা আফরোজ, শ্যালক কাজী ফরিদ হাসান, ব্যবসায়িক অংশীদার মোহাম্মদ বশির ও ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান প্রত্যেককে জরিমানা করা হয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা করে। কাজী ফুয়াদ হাসানকে জরিমানা করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে হিরুর নিয়ন্ত্রণাধীন ডিআইটি কো-অপারেটিভ লিমিটেডকে জরিমানা করা হয়েছে ৭ কোটি ৭৬ লাখ, সফটএভিয়ন লিমিটেডকে ২ কোটি ২৬ লাখ এবং তার পিতার মালিকানাধীন মোনার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টকে ২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। হিরু ও সাকিব আল হাসানের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মোনার্ক হোল্ডিংস লিমিটেডকেও জরিমানা করা হয়েছে ২৫ লাখ টাকা।
এছাড়া ২০২৩ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ৭ মে পর্যন্ত জেমিনি সি ফুড পিএলসির শেয়ার লেনদেন নিয়ে তদন্ত চালানো হয়। এতে বীকন ফার্মাসিউটিক্যালস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ এবাদুল করিমকে ১১ লাখ, তার মেয়ে রিসানা করিমকে ২ কোটি ১২ লাখ এবং ছেলে উলফাত করিমকে ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ ছাড়া এবাদুল করিমের শ্যালক সোহেল আলমকে ১০ লাখ এবং ফাতেমা সোহেলকে ১১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
আরেকটি তদন্ত চালানো হয় ২০২৩ সালের ১৮ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার লেনদেন কার্যক্রম ঘিরে। এ তদন্তে নূরজাহান বেগমকে ৭৫ লাখ, মো. সাজিদুল হাসান, মো. সায়েদুর রহমান ও মো. লুৎফুর রহমানকে ১ লাখ করে এবং ফেরদৌসী বেগমকে ১ কোটি ৯৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
এ ছাড়া সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের দায়ে ডায়ানেস্টি সিকিউরিটিজ লিমিটেড নামক প্রতিষ্ঠানকেও ৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।
এই তদন্তগুলো এবং শাস্তিমূলক সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট যে, পুঁজিবাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় বিএসইসি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠোর ভূমিকা নিচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা মনে করছে, আইন ভেঙে অস্বাভাবিক মুনাফা অর্জনের এই প্রবণতা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্ষুণ্ণ করে এবং বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই ভবিষ্যতে এমন অপরাধে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

