দীর্ঘদিন ধরে ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত ভেসে উঠেছে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতরণ করা অনিয়ম ও জালিয়াতিপূর্ণ ঋণের প্রকৃত চিত্র। এসব ঋণের একটি বড় অংশ এখন পরিণত হয়েছে খেলাপিতে। শুধু তাই নয় যেসব শিল্পগোষ্ঠী এতদিন খেলাপির তালিকায় ছিল না তাদের অনেকেই এখন শীর্ষ খেলাপির কাতারে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে বহু আলোচিত বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপ। এই দুই গ্রুপ দেড় দশক ধরে খেলাপিমুক্ত থাকলেও নতুন তালিকায় উঠে এসেছে তাদের নাম।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক বিশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংক খাতে বর্তমানে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকার মতো যা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৫৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। শুধু শীর্ষ ১০টি শিল্পগোষ্ঠীর খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের সময়ে ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠ কিছু ব্যবসায়ী গোষ্ঠীকে ‘বাছবিচারহীনভাবে’ ঋণ দেওয়া হয়। ওই সময় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা ঋণের তথ্য জানতে চাওয়ার সাহসও পাননি। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তখন খেলাপি হওয়া সত্ত্বেও এসব ঋণ ‘নিয়মিত’ হিসেবে দেখানো হতো। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব ঋণকে আবার খেলাপি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হচ্ছে ফলে হঠাৎ করে অনেক বড় গ্রুপ শীর্ষ খেলাপির তালিকায় চলে এসেছে।

তবে ঋণ আদায়ে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, ‘ঋণ আদায় না হওয়ায় সুদ বাড়তে থাকছে ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণও দিন দিন বাড়ছে।’ তিনি বলেন, ‘শীর্ষ খেলাপিরা ঋণ পরিশোধে কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছেন না অনেকে তো দেশেই নেই। আবার অনেকে রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। তারা ব্যাংকের সঙ্গে কোনো আলোচনায়ও আসছেন না।’
২০২৩ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় সংসদে পেশ করা শীর্ষ ২০ খেলাপির তালিকায় যেসব কোম্পানির নামই ছিল না বর্তমান তালিকায় দেখা যাচ্ছে তাদের অনেকেই উপরের দিকে উঠে এসেছে। যেমন- বেক্সিমকো ও এস আলম গ্রুপ। বর্তমান তালিকায় যে ১০টি গ্রুপ সবচেয়ে বড় খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে তাদের মধ্যে কয়েকটির নাম দেশজুড়ে পরিচিত নয় বলেও অনেকেই বিস্মিত।
বর্তমানে শীর্ষ খেলাপি প্রতিষ্ঠান বেক্সিমকো গ্রুপের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২১ হাজার ৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে ১৯ হাজার ৩৭২ কোটি এবং সোনালী ব্যাংকে ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। শেখ হাসিনা সরকারের সময় এই গ্রুপ বিশেষ সুবিধা পেতো বলে অভিযোগ রয়েছে। বেক্সিমকোর ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা। তিনি এবং তার ঘনিষ্ঠরা ২৩টি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন। তার গ্রেপ্তার ও কারাবরণের পর ব্যাংকগুলো বেক্সিমকোর বিভিন্ন কোম্পানিকে খেলাপি হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে বাধ্য হয়।
দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে এস আলম গ্রুপ। তাদের খেলাপি ঋণ ১১ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জনতা ব্যাংকে রয়েছে ৯ হাজার ৩৮৯ কোটি এবং ইউনিয়ন ব্যাংকে ২ হাজার ৪৬২ কোটি টাকা। চট্টগ্রামভিত্তিক এ গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল ইসলাম মাসুদ শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এস আলম গ্রুপ ১১টি ব্যাংক থেকে সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা নামে-বেনামে তুলে নিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তৃতীয় স্থানে রয়েছে এনোনটেক্স গ্রুপ, যাদের জনতা ব্যাংকে খেলাপি ঋণ ৭ হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এর কর্ণধার ইউনুছ বাদল। ব্যাংকটি প্রথমে এ গ্রুপের অর্ধেক সুদ মওকুফ করে দিলেও শেষ পর্যন্ত ঋণ আদায় করতে ব্যর্থ হয়।
চতুর্থ স্থানে রয়েছে চামড়া খাতের আলোচিত ক্রিসেন্ট গ্রুপ, যাদের খেলাপি ঋণ ৩ হাজার ৫১ কোটি টাকা, পুরোটাই জনতা ব্যাংকের। এই গ্রুপের কর্ণধার আবদুল কাদের ও তার ভাই চলচ্চিত্র পরিচালক আবদুল আজিজ।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে এফএমসি গ্রুপ (১ হাজার ৪৯৬ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংক), রতনপুর গ্রুপ (১ হাজার ২২৭ কোটি, জনতা ব্যাংক), জাকিয়া কটন টেক্স (১ হাজার ২১৪ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক), রাঙ্কা গ্রুপ (১ হাজার ১৭৩ কোটি, জনতা ব্যাংক), রিমেক্স ফুটওয়্যার (১ হাজার ১৩৪ কোটি, জনতা ব্যাংক) এবং জাজ ভূইয়া গ্রুপ (১ হাজার ৯১ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক)।
শীর্ষ ১০ খেলাপির মধ্যে ছয়টি গ্রুপকে ঋণ দিয়েছিল জনতা ব্যাংক, যার খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৫৫ কোটি টাকা। একসময় ভালো ব্যাংক হিসেবে পরিচিত জনতা ব্যাংক এখন খেলাপির চাপে সবচেয়ে বিপদগ্রস্ত রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তফা কে মুজেরী মনে করেন, ‘বিগত সরকার ঋণখেলাপির সংস্কৃতি সৃষ্টি করেছে। ব্যাংকগুলোকে ঋণ পুনঃতফসিল ও সুদ মওকুফের মতো সুবিধা দিয়ে দুর্বল করেছে। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকার হলেও জনগণের প্রত্যাশা ছিল ব্যাংক খাতে সংস্কারের জন্য তারা দৃঢ় পদক্ষেপ নেবে। কিন্তু বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।’
তিনি বলেন, ‘যদি এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়া হয় তাহলে ভবিষ্যতেও খেলাপির প্রবণতা বাড়বে। ব্যাংক খাত ক্রমশ ভঙ্গুর হয়ে পড়বে।’
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আশ্বস্ত করেছেন যে ভবিষ্যতে যাতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঋণ বিতরণের সুযোগ না থাকে সে লক্ষ্যে একটি নতুন ব্যাংক রেজুলেশন আইন তৈরি করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বড় খেলাপিরা শুধু পালায়নি তারা দেশের টাকা বিদেশেও পাচার করেছে। তার মতে দেশীয় সম্পদ ক্রোক করে কিছু টাকা উদ্ধার করা সম্ভব হলেও বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা খুব কঠিন। তবে এ জন্য একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে।
ঋণখেলাপি গ্রুপগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাংকগুলোর পক্ষ থেকে নানা আইনি উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তব অগ্রগতি খুবই ধীর। সোনালী ব্যাংকের এমডি শওকত আলী খান জানিয়েছেন, বেক্সিমকোর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা শুরু হয়েছে। ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি ইমরান আহমেদ জানান, এফএমসি গ্রুপ বহু আগেই খেলাপি হয়ে গেছে এবং পুনরুদ্ধারে ব্যাংক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অনেক গ্রুপ এখনো কোনো ধরনের আলোচনায় আসেনি।
এই বাস্তবতায় ব্যাংক খাতে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি ও অনিয়মের যে গভীর শেকড় তা কাটাতে হলে কেবল আইন নয় প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দৃঢ় সিদ্ধান্ত। অন্যথায় খেলাপি সংস্কৃতি শুধু সম্প্রসারিতই হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হবে জনগণের আমানত এবং অর্থনীতির ভিত।

