বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এক অভাবনীয় আর্থিক কেলেঙ্কারির চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায়। সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা নিরাপদ রাখার দায়িত্ব যাঁদের, সেই ব্যাংক পরিচালকরাই যেন হয়ে উঠেছেন সবচেয়ে বড় হুমকি। ‘রক্ষক হয়ে ভক্ষক’ হওয়াদের এই তালিকায় আছেন শতাধিক প্রভাবশালী পরিচালক, যাঁরা নাম-বেনামে, জাল দলিল ও ভুয়া কাগজপত্র দেখিয়ে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা। এই অর্থ কেলেঙ্কারি কেবল নজিরবিহীনই নয় এটি বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।
বর্তমানে দেশে ৫২টি সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংক এবং ৯টি বিদেশি ব্যাংক পরিচালিত হচ্ছে। এসব ব্যাংকে পরিচালকের সংখ্যা ৭৬০ জনের মতো। তবে এর মধ্যে অন্তত ১০০ জন পরিচালক সরাসরি ব্যাংক লুটপাটে জড়িত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে পরিচালকদের ব্যাংক ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ৯০ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ২০ আগস্ট পর্যন্ত সেই ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৩৩ হাজার ৮৮৫ কোটি টাকায়। অর্থাৎ আট বছরে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১৬০ শতাংশ।

পরিচালকরা শুধুমাত্র নিজেদের ব্যাংক থেকেই নয় একে অন্যের ব্যাংকের সঙ্গেও সমঝোতা করে বিশাল অঙ্কের ঋণ নিয়েছেন। নিজ ব্যাংকের শেয়ারের ৫০ শতাংশের বেশি ঋণ নেওয়া নিষিদ্ধ হলেও অন্য ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে কোনো বাধা নেই। এই ফাঁক দিয়েই তাঁরা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ঋণ তুলে নিয়েছেন। অনেকে আবার নিজেরা দৃশ্যপটে না থেকে আত্মীয়স্বজন এমনকি ড্রাইভার ও অফিস সহকারীদের নামে কোম্পানি খুলে অর্থ নিয়েছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্যে দেখা যায়, পরিচালকদের নিজ ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের পরিমাণ ১ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা হলেও অন্য ব্যাংক থেকে তাঁরা নিয়েছেন ২ লাখ ৩২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংখ্যা বাস্তবে আরও বেশি। তাঁদের ধারণা, বিগত ১৫ বছরে পরিচালকরা নামে-বেনামে যে প্রতিষ্ঠান গড়েছেন সেগুলোর সব ঋণ হিসাব করলে মোট ঋণের পরিমাণ ৫ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ব্যাংক পরিচালকরা এসব অর্থ ফেরত দেননি। অনেকেই দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন। এর ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হালনাগাদ রিপোর্টে পরিচালকদের নামে থাকা ঋণের অঙ্ক কমে গিয়ে এক লাখ কোটির ঘরে নামতে পারে। কারণ তালিকা থেকে বাদ পড়েছে এস আলম গ্রুপ, বেক্সিমকো, আরামিট ও প্রিমিয়ার গ্রুপের মতো পরিচালকদের নাম।
সবচেয়ে বেশি ঋণ দেওয়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, পূবালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি)। ইসলামী ব্যাংক থেকে পরিচালকেরা নিয়েছেন প্রায় ২৭ হাজার কোটি টাকা। পূবালী ব্যাংক থেকে ১৭ হাজার কোটি, জনতা ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক থেকে সাড়ে ১৩ হাজার কোটি এবং ইউসিবি থেকে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।
নিজ ব্যাংক থেকে ঋণ নেওয়ার দিক থেকেও এগিয়ে রয়েছে এবি ব্যাংক, যেখানে পরিচালকদের নিজস্ব ঋণের অঙ্ক প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে ইউসিবি (১৫০ কোটি), ব্র্যাক ব্যাংক (৯০ কোটি), স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক (৫৯ কোটি) এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক (৫২ কোটি টাকা)।
সরকার পরিবর্তনের পর ১৪টি ব্যাংকে পরিচালনা পর্ষদে রদবদল আনা হয়েছে। এই পরিবর্তনে পদ হারিয়েছেন ৫০ জনের বেশি পরিচালক, যাঁদের অনেকেই ঋণখেলাপি। তাঁদের অনেকেই বিদেশে পালিয়ে গেছেন। যেমন- এস আলম গ্রুপের মালিক সাইফুল আলম ও তাঁর ঘনিষ্ঠরা, যাঁরা ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকসহ বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন এখন দেশের বাইরে। তাঁরা প্রায় ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন।
ন্যাশনাল ব্যাংকের শিকদার গ্রুপের দুই ভাই রন হক ও রিক হক শিকদারসহ ১০ জন পরিচালকের বিরুদ্ধে ৪৬৯ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করেছে দুদক। আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক পানিসম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমও।
এছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও তাঁর পুত্র সায়ান ফজলুর রহমানের নামও উঠে এসেছে ঋণখেলাপির তালিকায়। সালমান এফ রহমান গ্রেপ্তার হয়েছেন, আর সায়ান ফজল আইএফআইসি ব্যাংকের পরিচালক পদ হারিয়েছেন।
এই লুটপাটের সুযোগ করে দিয়েছে দুর্বল নীতিমালা, নজরদারির অভাব এবং জবাবদিহিহীনতা। ন্যাশনাল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুখলেসুর রহমান বলেন, ব্যাংক খাতের দুরবস্থার পেছনে মূল সমস্যা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। ব্যাংক পরিচালনা থেকে শুরু করে রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত সবাই কোনো না কোনোভাবে সমঝোতায় ছিলেন। তিনি মনে করেন, এসব ঋণ আদায় করতে হলে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করতে হবে এবং প্রয়োজনে সরকারের উচিত ইন্টারপোলের মাধ্যমে অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা।
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিগত দেড় দশকে হাতে গোনা কিছু পরিচালক পুরো ব্যাংক খাতকে ধ্বংস করেছেন। এই ঋণ এখন ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জামানত বিক্রি করেও আদায় সম্ভব নয়, কারণ তা মোট ঋণের ১০ শতাংশও পূরণ করতে পারবে না। তাই তাঁর মতে, এখন সরকারের উচিত অভিযুক্তদের ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চালানো।
ব্যাংকাররা জানান, পরিচালকদের অবৈধ চাপ এবং হস্তক্ষেপের কারণে ব্যাংক পরিচালনার স্বাভাবিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। কোনো ব্যাংকে এমডি থাকলেও তিনি মূলত পরিচালকদের কাছে জিম্মি। ঋণ অনুমোদন, পুনর্গঠন, নিয়োগ সব জায়গাতেই চলছে পরিচালক কর্তৃত্ব। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর তদন্তও অনেক সময় লোক দেখানো হয়ে থাকে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- যেখানে ভালো উদ্যোক্তারা ব্যাংকে উচ্চ সুদ দিয়ে ঋণ চাইলে হয়রানি ও নানা শর্তে আটকে যান, সেখানে প্রভাবশালী পরিচালকরা শত শত কোটি টাকা নিয়ে চলে গেছেন দেশে-বিদেশে। তাঁরা বাড়ি, গাড়ি কিনে বিলাসবহুল জীবন যাপন করছেন। অথচ দেশের শিল্পপতিরা বিনিয়োগে যেতে গিয়ে বারবার ফিরে আসছেন খালি হাতে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, একজন পরিচালকের ন্যূনতম ২ শতাংশ শেয়ার থাকতে হয়। কোনো পরিবার বা গ্রুপের সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ শেয়ার থাকতে পারে। কিন্তু বাস্তবে বেনামি শেয়ারের মাধ্যমে একক গোষ্ঠী ব্যাংকের কর্তৃত্ব দখলে নিচ্ছে। তদন্তে উঠে এসেছে, একসময় যারা ২০-৫০ লাখ টাকার শেয়ার নিয়ে পরিচালক হয়েছিলেন তাঁরাই এখন হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণ নিয়ে যাচ্ছেন।
এই চিত্র শুধু একটি খাতের অনিয়ম নয় এটি দেশের আর্থিক নিরাপত্তা ও অর্থনীতির স্থিতিশীলতার ওপর একটি দীর্ঘমেয়াদি হুমকি। অবিলম্বে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত হয়তো আরেকটি বড় বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাবে।

