গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়ে গেছে প্রায় ২৮ লাখ কোটি টাকা। এই বিপুল অর্থপাচারের পেছনে মূলত রয়েছেন সাবেক সরকারদলীয় প্রভাবশালী রাজনীতিক, আমলা, ব্যবসায়ী ও তাদের ঘনিষ্ঠজনরা। ঘুষ, দুর্নীতি, কর ফাঁকি, চোরাচালানসহ বিভিন্ন অবৈধ উৎস থেকে অর্জিত অর্থ পাচারের অন্যতম প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠেছে হুন্ডি। বৈধ পথে টাকা পাঠানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রবাসী নানা জটিলতায় পড়ে হুন্ডির পথে টাকা পাঠাতে বাধ্য হচ্ছেন। অন্যদিকে হুন্ডিচক্র এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশে-বিদেশে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে।
মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে হুন্ডিকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলেও বাস্তবে এর নিয়ন্ত্রণ খুবই দুর্বল। হুন্ডি ব্যবসায় জড়িয়েছে মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) প্ল্যাটফর্মের অসাধু কিছু এজেন্ট। তারা মোটা অঙ্কের কমিশনের লোভে এ চক্রে যুক্ত হচ্ছে। অপরদিকে, দেশি-বিদেশি হুন্ডি চক্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে যোগাযোগ করছে বিভিন্ন এনক্রিপটেড মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে। এতে করে চিহ্নিত করাও হয়ে পড়েছে দুরূহ।
পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের কর্মকর্তারা জানান, দেশে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্টদের মাধ্যমেই নির্বিঘ্নে চালানো হচ্ছে হুন্ডি লেনদেন। পাশাপাশি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও হুন্ডির মাধ্যমে অর্থ পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পাচারের প্রমাণ না থাকায় অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।
সিআইডির প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) মো. ছিবগাত উল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, “হুন্ডিসহ বিভিন্ন মাধ্যমে দেশের অর্থ পাচার হয়ে গেছে। যাদের বিরুদ্ধে পাচারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের শনাক্ত করে টাকা ফেরত আনতে আমরা আন্তরিকভাবে কাজ করছি। ইতোমধ্যে যেসব মামলা হয়েছে, তা গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে যাতে আর কেউ অর্থ পাচার করতে না পারে, সেই দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে।”
হুন্ডির লেনদেন পদ্ধতি সম্পর্কে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা ও প্রাপক পরিবারের মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাকাউন্ট নম্বর সংগ্রহ করে হুন্ডিচক্র। এরপর প্রবাসী চক্র সদস্যরা এনক্রিপটেড অ্যাপের মাধ্যমে বাংলাদেশে থাকা অংশীদারদের কাছে সেই তথ্য পাঠায়। দেশের হুন্ডিচক্র মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টদের সহযোগিতায় নির্ধারিত অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেয়। প্রবাসীর পাঠানো সমপরিমাণ টাকা চক্রের কাছ থেকে সংগ্রহ করে দেশীয় হুন্ডিকারীরা। ফলে দেশে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা প্রবেশ না করে উল্টো টাকা পাচার হয় বিদেশে।
সিআইডির একটি তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, কেবল ঢাকার সাভারের এক প্রবাসী, যিনি সৌদি আরবে বসবাস করেন, আকামা সমস্যার কারণে ছয় মাস বৈধভাবে টাকা পাঠাতে পারেননি। ফলে বাধ্য হয়ে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠান। তার পাঠানো টাকা গিয়েছিল আত্মীয়ের বিকাশ অ্যাকাউন্টে, যেটি নজরে আসে সিআইডির। একইভাবে কুষ্টিয়ার এক প্রবাসীও দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে বসবাস করলেও আকামা জটিলতার কারণে হুন্ডির পথ বেছে নিয়েছেন।
এমন অন্তত ৫০টি ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে সিআইডি, যেগুলোর বেশির ভাগেই প্রবাসীরা বাধ্য হয়ে হুন্ডির পথ নিয়েছেন। এতে সরকার যেমন রাজস্ব হারাচ্ছে, তেমনি পাচার হয়ে যাচ্ছে বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক অর্থ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও জানিয়েছেন, দেশের হুন্ডিকারিদের বড় অংশই চট্টগ্রামভিত্তিক। অনেক ক্ষেত্রে তারা সরাসরি বাড়িতে গিয়ে গ্রাহকের হাতে টাকা পৌঁছে দেয়। গোয়েন্দা সংস্থার মতে, দুটি মোবাইল ব্যাংকিং কোম্পানির মাধ্যমে হুন্ডির লেনদেন সবচেয়ে বেশি হচ্ছে। দ্রুত লাভের আশায় এসব কোম্পানির অসাধু এজেন্টরাও এই অবৈধ কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে। এখন পর্যন্ত শতাধিক হুন্ডি-সম্পৃক্ত এজেন্ট গ্রেপ্তার হলেও অনেকেই ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।
বাংলাদেশের অর্থ পাচার সংক্রান্ত একটি শ্বেতপত্র অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সময়ে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে ২৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার, যা টাকায় ২৮ লাখ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। এ পাচারে রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের সংশ্লিষ্টতারও প্রমাণ মিলছে। যেমন সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর আত্মীয় মো. মামুন সালাম ও তার স্ত্রী কানিজ ফাতেমাসহ আটজনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ থানায় সিআইডি মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে।
বাংলাদেশ জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, দুই কোটিরও বেশি বাংলাদেশি প্রবাসে রয়েছেন, যাদের বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত। তাদের আয়ের ওপর নির্ভরশীল দেশের অর্থনীতি। কিন্তু এ বিপুল সংখ্যক প্রবাসীর আয় বৈধপথে দেশে না আসার অন্যতম কারণ হুন্ডি। প্রবাসীরা অনেক সময় বৈধপথে টাকা পাঠাতে পারেন না আকামা জটিলতা বা কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়ার ভয়ে। আবার অনেকেই গোপনে বাড়তি আয় করে থাকেন, যা বৈধ পথে পাঠানোর সুযোগ না থাকায় হুন্ডির মাধ্যমে দেশে পাঠান।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে দেশের বৈধ রেমিট্যান্সের পরিমাণ মোট লেনদেনের মাত্র ৫১ শতাংশ। বাকি ৪৯ শতাংশ অর্থ লেনদেন হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। এর ফলে একদিকে সরকার রাজস্ব হারাচ্ছে, অন্যদিকে বিদেশে যাচ্ছে দেশের সঞ্চিত অর্থ।
হুন্ডির এই বিস্তৃত চক্র ভেঙে ফেলার জন্য জরুরি ভিত্তিতে কঠোর নজরদারি ও প্রযুক্তিনির্ভর তদন্তের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে প্রবাসীদের বৈধপথে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে জটিলতা দূর করাও সময়ের দাবি। না হলে দেশের অর্থনীতি প্রতিনিয়ত রক্তক্ষরণে ভুগতে থাকবে, যা দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে।

