গত ১৫ বছরে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশের ব্যাংক খাতে দুঃসহ লুটপাটের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২০টি ব্যাংকের প্রায় পৌনে ২ লাখ কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। ব্যাংক দখলের মাধ্যমে ও ঋণের আড়ালে এ বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেছেন ক্ষমতাসীন ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীর কিছু ব্যক্তি ও গোষ্ঠী।
২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) ওই ২০টি ব্যাংকের সম্মিলিত মূলধন ঘাটতি দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৭১ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী প্রান্তিকের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) তুলনায় এক লাখ ১৮ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা বেশি। তখন মূলধন ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৫৩ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা। যদিও কিছু ব্যাংকে মূলধন উদ্বৃত্ত থাকায় সামগ্রিকভাবে ব্যাংক খাতের মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক লাখ ১৭ হাজার ৬৪৭ কোটি টাকায়। অথচ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে মূলধন ঘাটতিতে ছিল ১০টি ব্যাংক এবং সেই ঘাটতির পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদনে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি মূলধন ঘাটতি জনতা ব্যাংকে ৫২ হাজার ৮৯১ কোটি টাকা। এরপর রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (১৮,১৯৯ কোটি), ইউনিয়ন ব্যাংক (১৫,৬৯০ কোটি), ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক (১৩,৯৯১ কোটি), ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ (১২,৮৮৫ কোটি) এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক (১১,৭০৯ কোটি টাকা)।
এছাড়া আইএফআইসি ব্যাংকের ঘাটতি ৯ হাজার ২৯ কোটি, ন্যাশনাল ব্যাংকের ৭ হাজার ৭৯৯ কোটি, রূপালী ব্যাংকের ৫ হাজার ১৯২ কোটি, পদ্মা ব্যাংকের ৪ হাজার ৯৮৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংকের ৪ হাজার ৬৮৬ কোটি, বেসিক ব্যাংকের ৩ হাজার ১৫৬ কোটি, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের ২ হাজার ৯০৫ কোটি এবং রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ২ হাজার ৪৭০ কোটি টাকা।
আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ও হাবিব ব্যাংক মিলিয়ে আরও কয়েক হাজার কোটি টাকার ঘাটতির তথ্যও উল্লিখিত হয়েছে।
মূলধনের ঘাটতি শুধু সংখ্যা নয় এটি ব্যাংকের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতা, ঋণ বিতরণ ক্ষমতা, এমনকি আন্তর্জাতিক লেনদেনের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্যাসেল-৩ নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ব্যাংকের ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের কমপক্ষে ১০ শতাংশ বা ৫০০ কোটি টাকার মূলধন থাকতে হয়। যেসব ব্যাংক এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয় তাদের মূলধন ঘাটতিতে পড়া ব্যাংক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মূলধন সাধারণত উদ্যোক্তাদের প্রাথমিক বিনিয়োগ এবং মুনাফা থেকে সংরক্ষণের মাধ্যমে গঠিত হয়। কিন্তু উচ্চ খেলাপি ঋণ ও লোকসানের কারণে অনেক ব্যাংক এই সংরক্ষণ করতে পারছে না। ফলে তারা লভ্যাংশও দিতে পারছে না, যা ব্যাংকের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা হ্রাস করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৪ কোটি ৭৬ লাখ টাকা, যা ২০২৩ সালের একই সময়ে ছিল এক লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ বেড়েছে এক লাখ কোটি টাকার বেশি।
এছাড়া একই সময়ে ঋণ অবলোপনের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮১ হাজার ৫৭৮ কোটি টাকায়, যা আগের বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ৭১ হাজার ৮১৭ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণ অবলোপন বেড়েছে ৯ হাজার ৭৬১ কোটি টাকা।
পাশাপাশি পুনঃতফসিল করা ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৫ হাজার ১২২ কোটি টাকা। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ, অবলোপন ও পুনঃতফসিল—এই তিন মিলিয়ে ব্যাংক খাতের বড় অংশই ঝুঁকির মুখে।
অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান এবং গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নুরুল আমিন বলেন, খেলাপি ঋণের উচ্চহার এবং প্রভিশনের ঘাটতি মূলধন সংকটকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, এসব ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে লোকসান করলেও রাজনৈতিক প্রশ্রয়ে তাদের দুর্বলতা আড়াল করা হতো। এখন বাস্তব চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে।
তার মতে, মূলধন ঘাটতির কারণে ব্যাংকের ঋণ বিতরণ ক্ষমতা কমে যায়, ফলে আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয় এবং ব্যাংক সুনাম হারায়। এমন ব্যাংকগুলো আন্তর্জাতিক ক্রেডিট রেটিংয়ে নিচে নেমে আসে, যার প্রভাব পড়ে বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গে লেনদেনেও। অনেক ক্ষেত্রে এলসি খোলার জন্য মার্জিনও বাড়তে পারে।
অন্যদিকে, অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ বলেন, গত ১৫ বছরে দেশের আর্থিক খাতে যে ‘পতিত সরকার’ অরাজকতা তৈরি করেছিল, তা অকল্পনীয়। তার মতে, বর্তমানে দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে অন্তত ৩০টির অবস্থা ভালো নয়। কিছু ব্যাংক এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পর্যন্ত নিয়মিত দিতে পারছে না। এমনকি আমানতকারীদের টাকাও ফেরত দিতে পারছে না বহু ব্যাংক ও নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
সবমিলিয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত ব্যাংক লুটপাটের প্রভাব এখন গোটা অর্থনীতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, ঋণ আদায়ে কঠোরতা, এবং ব্যাংক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা। অন্যথায় মূলধন ঘাটতির এই দুষ্টচক্র ক্রমেই গভীর হবে যা ব্যাংক খাতের ওপর জনগণের আস্থা সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে ফেলতে পারে।

