২০২২ সালের বন্যায় আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়কের জন্য সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের উদ্যোগে ৬৮০ কোটি টাকার বিশাল ব্যয়ের প্রকল্প নেওয়ার ঘটনা সম্প্রতি তদন্তে ধরা পড়েছে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অন্তর্বর্তী সরকারের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকৃতপক্ষে সড়কটির ক্ষতির মাত্রা এতটাই কম যে অল্প টাকায় মেরামত করাই যথেষ্ট ছিল।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলার মধ্যে অবস্থিত সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই-হবিগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কটির দৈর্ঘ্য ৩০ কিলোমিটার। এই সড়কটির উন্নয়ন ও মেরামতের জন্য নেওয়া প্রকল্পে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৬৮০ কোটি টাকা। যদিও প্রকৃত তদন্তে বেরিয়ে এসেছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মাত্র ৭৫০ মিটার অংশ, যার মেরামতে সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ কোটি টাকা ব্যয় করলেই যথেষ্ট ছিল।
এই ব্যাপারে রোববার (২৫ মে) সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান ‘বুড়ো উপদেষ্টারা কী করে’ শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন। তিনি লিখেন, “হবিগঞ্জ এলাকায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত একটি সড়ক মেরামত ও প্রশস্তকরণ প্রকল্পে প্রায় ৩০ কিলোমিটার রাস্তার জন্য ৬৮০ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়। সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে সরকারি ক্রয় কমিটির অনুমোদনের জন্য পাঠানোর পাশাপাশি মন্ত্রণালয় থেকে একজন কর্মকর্তাকে সরেজমিনে পাঠানো হয়। তদন্তে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে পুনর্নির্মাণের প্রয়োজন মাত্র ৭৫০ মিটারে।”
তিনি আরও জানান, “হাওর অঞ্চলের রাস্তাটিতে যানবাহন চলাচল সীমিত, কোনো শিল্পকারখানা নেই। প্রকল্পের যৌক্তিকতা নেই। তাই সব টেন্ডার ও ক্রয় প্রস্তাব বাতিল করা হয়েছে।… ভালো রাস্তা মেরামত করে প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও রাজনীতিবিদদের লুটপাটের দারুণ বন্দোবস্ত করা হয়েছিল।”
সরাইল থেকে হবিগঞ্জ শহর পর্যন্ত এই সড়কটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর ও হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলা হয়ে যাতায়াতের জন্য ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানজট তৈরি হলে মাঝে মাঝে বিকল্প হিসেবে এই সড়ক ব্যবহার করা হয়। তবে নিয়মিত চলাচলকারী যানবাহনের মধ্যে রয়েছে অটোরিকশা, ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল। খুব সীমিত সংখ্যক বাস এই পথে চলাচল করে।
সওজ সূত্র জানায়, বর্তমানে সড়কটির প্রস্থ ৫.৫ মিটার বা প্রায় ১৮ ফুট। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে এই সড়কটিকে “২০২২ সালের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ সড়ক বিভাগাধীন বিভিন্ন সড়ক, সেতু ও কালভার্টসমূহের জরুরি পুনর্বাসন ও পুনর্নির্মাণ” প্রকল্পের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য সড়কটিকে চারটি প্যাকেজে ভাগ করে কাজ নির্ধারণ করা হয়।
এর মধ্যে সাড়ে ৯ কিলোমিটার সড়ক সম্প্রসারণ ও মেরামতের জন্য নির্ধারিত হয় প্রায় ১৪৩ কোটি টাকা। ঠিকাদার হিসেবে নির্বাচিত হয় মোস্তফা জামান ট্রেডার্স, মোস্তফা কামাল ও ইডেন প্রাইস (যৌথভাবে), যাদের দর ছিল ১৪২ কোটি ৮০ লাখ টাকা। প্রক্রিয়াটি গত মাসে সরকারি ক্রয় উপদেষ্টা পরিষদের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে সন্দেহের ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় একজন কর্মকর্তাকে পরিদর্শনে পাঠায়।
সরেজমিন তদন্তে দেখা যায়, ক্ষতিগ্রস্ত অংশের দৈর্ঘ্য ৭৫০ মিটার মাত্র। এত অল্প দূরত্ব মেরামতের জন্য ১০-১৫ কোটি টাকা যথেষ্ট ছিল, অথচ প্রকল্পটি দ্বিগুণ প্রস্থে উন্নীত করে সম্পূর্ণ সড়ক মেরামতের নামে বিপুল ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়। সওজের হিসাবে, ৩০ কিলোমিটার সড়কের জন্য বড়জোর ৮০-১০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।
এ প্রসঙ্গে জানা গেছে, সওজ ১০.৩ মিটার প্রস্থে উন্নীত করার জন্য দরপত্র আহ্বান করে এবং এর ব্যয় সরকারকে রাজস্ব খাত থেকে বহন করতে হতো। ২০২৩ সালের মে মাসে আহ্বান করা দরপত্রগুলোর মেয়াদ বাড়িয়ে ঠিকাদার নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছিল চলতি বছরের মে মাসেও। এর মধ্যেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পাল্টে যায় এবং ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।
ঠিকাদারি প্রক্রিয়া পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চারটি প্যাকেজেই একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বারবার অংশ নিয়েছে। একটি প্যাকেজে কেউ সর্বনিম্ন দরদাতা অন্যটিতে সর্বোচ্চ। এই নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
সওজের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিগত সরকারের আমলে দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্ধারিত হয়ে যেত কোন ঠিকাদার কোন কাজ পাবে। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ, সওজ এবং মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশে প্রকল্প ভাগাভাগি হতো।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে জোর দিয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা যাচাই করতে মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সরেজমিনে পাঠানো হচ্ছে, যার ফলে একের পর এক অনিয়ম সামনে আসছে।
এ ধরনের আরেকটি অনিয়মের উদাহরণ হলো, নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর হয়ে নবীনগর পর্যন্ত চলমান একটি সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পে সরাইল-নাসিরনগর-লাখাই-হবিগঞ্জ সড়কের একটি প্যাকেজ ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। অথচ এই দুই প্রকল্পের ভৌগোলিক দূরত্ব শত কিলোমিটারের কাছাকাছি। ওই প্রকল্পে ওয়াহিদ কনস্ট্রাকশন নামে একটি প্রতিষ্ঠান ৩৪৩ কোটি টাকার দর প্রস্তাব করে। মন্ত্রণালয় সেটিও ফের দরপত্র আহ্বানের নির্দেশ দিয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, পছন্দের ঠিকাদারদের বড় অঙ্কের কাজ পাইয়ে দিতে সওজে প্রকল্পকে অতিরঞ্জন করে উপস্থাপনের প্রবণতা রয়েছে। হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মোড়াকরি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মোল্লাও বলেন, “বন্যায় রাস্তাঘাটের ক্ষতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পুরো ৩০ কিলোমিটার নয়। একটু যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।”
প্রকল্পের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে প্রকৌশলীরা দাবি করেন, এটি স্থানীয় প্রাণী, মৎস্য ও কৃষি উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে কথা বলে তেমন কোনো বাস্তবতা খুঁজে পাননি। বরং মৎস্য দপ্তর থেকে জানানো হয়, ঐ অঞ্চলের পরিবহন সাধারণত নৌপথে হয় এবং সড়ক সম্প্রসারণে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন খাতে অপ্রয়োজনীয় বিপুল ব্যয়ের ফলে সরকারকে এখন ঋণের চাপ সামলাতে হচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়েনি তেমন, অথচ ব্যয় বেড়েছে অনেক গুণ। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার ব্যয় সংকোচনের নীতি গ্রহণ করেছে।
সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বলেন, “বর্তমান সরকার অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বন্ধে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সড়কে অকার্যকর ব্যয় রোধ করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।” সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এটা কেবল একজনের জন্য নয় সবার জন্য একটি বার্তা এ ধরনের অপচয় বরদাশত করা হবে না।”

