ঢাকা শহরকে আমরা আজ আর কেবল একটি রাজধানী হিসেবে দেখি না। এটি হয়ে উঠেছে এমন এক প্রতীকী নগরী, যেখানে দেশের রাজনৈতিক ব্যর্থতা, কৃত্রিম উন্নয়ন এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। প্রশ্ন উঠছে, এই শহর কি শুধু ইট-পাথরের রাজনীতি কেন্দ্র, নাকি এটি আসলে আমাদের জাতীয় আত্মপরিচয়ের একটি বেদনার প্রতিচ্ছবি?
এই শহরের গায়ে “দুর্নীতিবাজ রাজনীতির রাজধানী” অভিধাটি একেবারেই মানানসই। জাতীয় সংসদ ভবন, সচিবালয়, মন্ত্রীদের দপ্তর, রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয় সবই গড়ে উঠেছে এই নগরীতে। প্রতিদিন রাজপথে নামে শত শত মিছিল, ফুটে ওঠে ব্যানার, শোনা যায় স্লোগানের আওয়াজ। নগরের প্রতিটি মোড়, দেয়াল, এমনকি পার্ক পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রচারণার মঞ্চে পরিণত হয়েছে। অথচ সেই রাজনীতির কতটুকু নাগরিকস্বার্থে পরিচালিত হয় তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
রাজনীতি এখানে যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান। হাজার হাজার তরুণ বেকার ভাড়া খেটে আন্দোলনে অংশ নেয়, রাস্তা অবরোধ করে, অবস্থান নেয় বিভিন্ন দপ্তরের সামনে। এই বিশাল জনশক্তিকে যদি বাস্তব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা যেত তাহলে ঢাকাকে আজ নর্দমা বলেও অভিহিত করতে হতো না।
শহরের বাস্তব চিত্র করুণ। প্রতিদিন নাগরিকরা আটকে পড়েন অবর্ণনীয় যানজটে, হাঁসফাঁস করেন ধুলা ও ঘামে, যুদ্ধ করেন অনিশ্চয়তার সঙ্গে। আগুন লাগে কোনো ভবনে, পানির সংকটে ক্লান্ত হয় জনজীবন, বারবার ধসে পড়ে ভবন। আর এসবের পেছনে আছে ফুটপাত দখল, খাল ভরাট, নদী হরণ, অকার্যকর নগর পরিকল্পনা আর নিঃস্ব হৃদয়ে গৃহীত তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প।
গাছ কেটে রাস্তা বানানো হয় কিন্তু সেই রাস্তার পাশে নেই একটুকরো ছায়া। নাগরিকদের জন্য নেই হাঁটার পথ নেই প্রশান্তি। উন্নয়নের নামে যা চলছে তা যেন কেবল নাগরিক অধিকার হরণ ও জীবনের মূল্যবোধ ধ্বংসের এক আয়োজন।
বুড়িগঙ্গা নদী, একসময় ঢাকার প্রাণ আজ বিষাক্ত বর্জ্যের গহ্বরে পরিণত হয়েছে। ঢাকাকে ভালোবাসার দাবি যারা করেন, তারা কেউই আজ এই নদীর অস্তিত্ব রক্ষায় রাস্তায় নামেন না। বাণিজ্যিক আগ্রাসনে গিলে ফেলা হয়েছে নদী। কিন্তু তার বিরুদ্ধে নেই কোনো জনমত নেই কোনো প্রতিবাদ। মিছিলের ঢেউ যেখানে প্রতিদিন রাস্তায় সেখানে বুড়িগঙ্গার জন্য কারও কণ্ঠ ওঠে না।
রাজনৈতিক স্লোগান আজ জিভে উঠে গেছে অনেকের “এই দেশ শেখ হাসিনার বাপের না”। কিন্তু কেউ বলে না, “এই দেশ দুর্নীতিবাজদের না”, “এই দেশ ভাড়াটে রাজনীতির কর্মীদের না।” কেন আমরা রাষ্ট্রকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারি না? এই মৌনতা কি শুধুই ভয় নাকি বিবেকহীন এক ক্লান্ত জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি?
প্রতিবছর ডেঙ্গুতে প্রাণ হারায় অসংখ্য মানুষ। হাসপাতালের শয্যা কমে আসে, প্রয়োজনীয় ওষুধ মেলে না, নাগরিক দুর্ভোগ চরমে পৌঁছায়। অথচ সেই দুর্ভোগের বিরুদ্ধে কোনো কণ্ঠ ওঠে না। রাজপথে তখনো মুখর রাজনৈতিক জটলা কিন্তু নাগরিক অধিকার ও জীবনের সুরক্ষার প্রশ্নে অচল নীরবতা।
এই কি আমাদের উন্নয়ন? এটাই কি বিবেক? এই কি নাগরিক দায়িত্ববোধ? শহরের দেয়ালে, পোস্টারে, শব্দদূষণে আর বিক্ষোভের আওয়াজে যদি থাকে কেবল ক্ষমতার লড়াই তবে উন্নয়নের অর্থ কি শুধুই গণবিরোধী বিভ্রম?
ঢাকা এখন আর শুধু একটি শহর নয় এটি হয়ে উঠেছে এক ব্যর্থ রাষ্ট্রপরিচয়ের নগ্ন স্বীকৃতি। শব্দদূষণ আর দুর্নীতির চাপে এখানে বিবেকও আজ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে যে মুখোশ পরানো হচ্ছে নগরজীবনে তার নিচে চাপা পড়ে যাচ্ছে মানুষের মৌলিক অধিকার জীবনযাপন আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
এই শহর যদি বাঁচাতে হয় তবে আগে দরকার বিবেকের জাগরণ, দায়বদ্ধতার পুনরাবিষ্কার এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের বাস্তবায়ন। ঢাকাকে ভালোবাসা মানেই কেবল আবেগে নয় চেতনাতেও প্রতিবাদ করা।

