খুলনায় ৩২টি সরকারি দপ্তরের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি এবং নাগরিক হয়রানির নানা অভিযোগ নিয়ে অনুষ্ঠিত হলো গণশুনানি। দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আয়োজনে রবিবার খুলনা জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এই গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নিয়ে ভুক্তভোগীরা তাদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের সেবা পেতে গিয়ে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মুখোমুখি হওয়ার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে তারুণ্যের একতা, গড়ব আগামীর শুদ্ধতা’—এই স্লোগানকে সামনে রেখে সেবাবঞ্চিত ও হয়রানির শিকার নাগরিকদের অভিযোগ সরাসরি শুনতেই দুদক এ গণশুনানির আয়োজন করে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ), খুলনা জেলা পরিষদ, খুলনা ওয়াসা, জেলা নির্বাচন কার্যালয়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ওজোপাডিকো), পরিবেশ অধিদপ্তর, কর অফিস, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ), ডাচ-বাংলা ব্যাংক, বন বিভাগ, খুলনা সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ মোট ৩২টি দপ্তরের বিরুদ্ধে ১৪২টি অভিযোগ জমা পড়ে।
এই অভিযোগগুলোর মধ্যে ৬৬টি বিষয়কে শুনানির জন্য বাছাই করা হয় এবং এদিন মোট ২৩টি অভিযোগের ওপর সরাসরি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এসব অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ জমা পড়ে খুলনা সিটি করপোরেশন, খুলনা মেডিকেল কলেজ (খুমেক) হাসপাতাল, খুলনা বিআরটিএ, খুলনা জেলা পরিষদ ও জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের বিরুদ্ধে।
গণশুনানিতে ডুমুরিয়া উপজেলার ব্যবসায়ী সুজিৎ পাল অভিযোগ করেন, চুকনগর বাজারে দোকানঘর বরাদ্দ দেওয়ার নামে জেলা পরিষদের কয়েকজন কর্মকর্তা তার কাছ থেকে ৯ লাখ টাকা নেন। কিন্তু পরবর্তীতে তাকে দোকান না দিয়ে সময়ক্ষেপণ করতে থাকেন এবং একপর্যায়ে তাকে অন্য এক ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। সেই ব্যক্তি আরও ২৫ লাখ টাকা দাবি করেন। সুজিৎ পাল পূর্বের ৯ লাখ টাকা ফেরত চাইলে তাকে কোনো টাকাই দেওয়া হয়নি উপরন্তু ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়।
খুলনা সিটি করপোরেশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তানজিল নামের এক নাগরিক। তিনি জানান, বাসার হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্মূল্যায়নের (রিভিউ) জন্য তার পরিবারের কাছে ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করা হয়।
অন্যদিকে জাহাঙ্গীর আলম, সাঈদুর রহমান ও আসলাম শেখ নামের তিনজন ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, তারা তিন বছর আগে বিআরটিএতে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত লাইসেন্স পাননি। শুধু লার্নার লাইসেন্সের সময়সীমা বাড়ানোর নাম করে বারবার হয়রানি করা হচ্ছে।
গণশুনানিতে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে আমলে নিয়ে দুদক তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং কিছু অভিযোগের ক্ষেত্রে সরাসরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। একইসঙ্গে জেলার প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহির আওতায় আনতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুদক কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী। তিনি বলেন, “গণশুনানির মূল উদ্দেশ্য হলো সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠস্বর সরাসরি শোনা এবং তাৎক্ষণিকভাবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কোনো নাগরিক যাতে সরকারি সেবা পেতে গিয়ে দুর্নীতির শিকার না হন তা নিশ্চিত করাই আমাদের অঙ্গীকার।”
এ ধরনের গণশুনানি দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

