সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় উপজেলা পর্যায়ে দেশের প্রথম সাততলা বিশিষ্ট দৃষ্টিনন্দন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মিত হলেও এখনও চালু হয়নি সেখানে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম। প্রায় ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই আধুনিক ভবনটি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে ৩১ শয্যার হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা ছিল, নতুন এই ভবনের মাধ্যমে বাড়বে জনবল, আসবে অত্যাধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং বন্ধ থাকা বিভাগগুলো চালু হলে প্রান্তিক মানুষের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবার দ্বার খুলে যাবে। কিন্তু নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার চার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও এখনো ভবনটি চালুর অনুমতি না মেলায় হতাশ হয়ে পড়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ২০ মার্চ ভবনের কার্যাদেশ অনুমোদন করা হয়। এরপর ৩ এপ্রিল শুরু হয় পাইলিংয়ের কাজ এবং ৫ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। নির্ধারিত সময় ছিল ১৮ মাস। সেই সময়সীমা পার হলেও দীর্ঘ বিলম্বে শেষ হয় নির্মাণকাজ, কিন্তু এতদিন পরও চালু হয়নি সেবা কার্যক্রম। ফলে কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষ।
নবনির্মিত সাততলা ভবনের প্রতিটি তলায় রয়েছে নির্দিষ্ট কার্যক্রমের জন্য পরিকল্পিত পরিকাঠামো। প্রথম তলায় আউটডোর বিভাগ, দ্বিতীয় তলায় কনসালট্যান্ট চেম্বার, তৃতীয় তলায় প্রশাসনিক কার্যক্রম, চতুর্থ তলায় স্টোর ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ, পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় আধুনিক অপারেশন থিয়েটার এবং সপ্তম তলায় নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এসব সুবিধা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে তা রোগীদের নাগালে আসেনি। লিফট স্থাপন করা হলেও সেটি অকেজো হয়ে পড়ায় ব্যবহার করা যাচ্ছে না। এছাড়া ভবনের সামনে গাড়ি পার্কিংয়ের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় ভোগান্তি বাড়িয়েছে আরও।
এদিকে হাসপাতালের পুরাতন ভবনটি ১৯৬৮ সালে নির্মিত। দীর্ঘদিন ধরে ব্যবহারের ফলে তা এখন জরাজীর্ণ। জনবল সংকট, অব্যবস্থাপনা ও পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানে সুষ্ঠুভাবে চিকিৎসাসেবা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ফলে নতুন ভবন নির্মাণের পর জনমনে আশা জেগেছিলো এবার হয়তো কাঙ্ক্ষিত সেবার দেখা মিলবে। কিন্তু নতুন ভবন চালু না হওয়ায় এখনও রোগীদের পুরোনো ভবনের সংকুচিত ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশেই চিকিৎসা নিতে হচ্ছে অনেক সময় ওয়ার্ডে জায়গা না পেয়ে মেঝেতেও অবস্থান করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, “আমরা আশা করেছিলাম, সাততলা এই ভবনের মাধ্যমে আমাদের চিকিৎসা সংকট দূর হবে। কিন্তু বাস্তবে এখনও আমাদের সিলেট শহরের দিকে ছুটতে হচ্ছে সামান্য অসুখের জন্যও। ভবন নির্মাণ হয়েছে কিন্তু সেবা শুরু হয়নি এটাই আমাদের বড় হতাশার জায়গা।”
বালাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হেপি দাস জানান, “আমরা অনেক কষ্ট করে পুরোনো ভবনেই সেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল সংকট তো রয়েছেই। দেশের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম সাততলা বিশিষ্ট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হিসেবে এই ভবনটি একটি দৃষ্টান্ত হলেও বর্তমানে এটি কেবল অনুমতির অপেক্ষায়।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. নাসির উদ্দিন বলেন, “জনবল সংকটের কারণেই নতুন ভবনে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, দেশের স্বাস্থ্যখাতে উপজেলা পর্যায়ে আধুনিকীকরণে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও, বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রিতা এবং প্রশাসনিক জটিলতা সাধারণ মানুষের জন্য কাঙ্ক্ষিত সেবা প্রাপ্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন প্রয়োজন দ্রুত অনুমতি প্রদান ও জনবল সংকট নিরসন যাতে করে বালাগঞ্জের প্রান্তিক জনগণ তাদের প্রাপ্য স্বাস্থ্যসেবা থেকে আর বঞ্চিত না হন।

