আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের ঘটনা সামনে এসেছে, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার পরিবারের সদস্যরা। গণআন্দোলনের মুখে দেশত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান তদন্তে অর্থ পাচারের নানা তথ্য উঠে এসেছে। এসব অর্থ ও সম্পদ শনাক্তে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
সরকার এ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত চারটি সংস্থার সহযোগিতা নিচ্ছে। সংস্থাগুলো হলো- দ্য স্টোলেন অ্যাসেট রিকভারি (STAR), ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্টি করাপশন কো-অর্ডিনেশন সেন্টার (IACCC), যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস এবং ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর অ্যাসেট রিকভারি (ICAR)। এসব সংস্থার সহায়তায় সরকারের পাশাপাশি সংস্থাগুলো নিজেরাও স্বাধীনভাবে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।
তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনা পরিবারের পাচার করা অর্থের অবস্থান মিলেছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, হংকং এবং কেইম্যান দ্বীপপুঞ্জে। এসব দেশের কাছে এখন মিচুয়্যাল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট (MLAR) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে, যাতে পাচারকৃত অর্থ ও সম্পদ জব্দ করা যায়।
বিএফআইইউ এবং সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রাথমিক তদন্তে শেখ হাসিনা পরিবারের বিরুদ্ধে ১ লাখ ২১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে দেশে ২ হাজার কোটি টাকার সম্পদ ইতিমধ্যে জব্দ করা হয়েছে। এছাড়া প্রকল্পের নামে বিদেশে পাচার বা আত্মসাত করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৯ হাজার কোটি টাকা। এসব তথ্য উঠে এসেছে একাধিক জাতীয় তদন্ত সংস্থার রিপোর্টে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার ব্যাপক আন্দোলনের মুখে পদত্যাগ করে দেশ ত্যাগ করেন শেখ হাসিনা। তার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত পাঁচটি বড় দুর্নীতির অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পূর্বাচলে রাজউকের ছয়টি প্লট অবৈধভাবে দখল, সূচনা ফাউন্ডেশন, সিআরআই (সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন) এবং বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টে অনিয়ম, রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত, যুক্তরাষ্ট্রে ৩৭ হাজার কোটি টাকা পাচার এবং আটটি সরকারি প্রকল্প থেকে প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা আত্মসাত।
এ পর্যন্ত দায়ের করা মামলাগুলোর ভিত্তিতে দেশে মোট ৮৮৭ কোটি টাকার স্থাবর সম্পত্তি এবং ১ হাজার ৪৫ কোটি ২৫ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পত্তি জব্দ করা হয়েছে। পাশাপাশি ১ হাজার ৯৩২ কোটি ২৫ লাখ টাকার সম্পদ অবরুদ্ধ করা হয়েছে। তদন্ত সংস্থাগুলো এই অভিযোগগুলোর পক্ষে প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও তথ্যপ্রমাণ সংগ্রহ করেছে।
জব্দ করা স্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে পূর্বাচলে ৬০ কাঠা জমি বা ছয়টি প্লট, যার দলিল মূল্য মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা হলেও বাজার মূল্য প্রায় ১২০ কোটি টাকা। গুলশান ও সেগুনবাগিচায় ৯টি ফ্ল্যাট, গুলশানে একটি বাড়ি এবং খুলনার দিঘলিয়ায় ২.০৪ একর জমিও জব্দ করা হয়েছে। এসবের দলিল মূল্য ১৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা হলেও বাজার মূল্য প্রায় ৭৬৭ কোটি টাকা।
অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে রয়েছে ১৫৬টি ব্যাংক হিসাব যেগুলোতে মোট স্থিতি ১ হাজার ৪৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা।
শেখ হাসিনার মেয়ে সায়মা ওয়াজেদ পুতুলের সূচনা ফাউন্ডেশনের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ৫৩২ কোটি টাকা, যার মধ্যে ৪৬৫ কোটি টাকা ইতিমধ্যে উত্তোলন করা হয়েছে এবং বর্তমান স্থিতি ৬৭ কোটি টাকা। জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাংকের করপোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (CSR) তহবিল থেকে সূচনা ফাউন্ডেশনে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা স্থানান্তর করা হয়। এ কাজে সহায়তা করেন এক্সিম ব্যাংক ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (BAB) সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছে সিএসআর তহবিল থেকে অর্থ দিতে BAB এর পক্ষ থেকে চিঠিও পাঠানো হয়।
আওয়ামী লীগের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিআরআই-এর নামে ৩৫ কোটি ২১ লাখ টাকার ফিক্সড ডিপোজিট রসিদ (এফডিআর) পাওয়া গেছে। প্রতিষ্ঠানটির লেনদেন নিয়ে তদন্ত চলছে। সিআরআই ট্রাস্টি বোর্ডে চেয়ারম্যান হিসেবে আছেন সজীব ওয়াজেদ জয়, ভাইস চেয়ারম্যান সায়মা ওয়াজেদ পুতুল এবং ট্রাস্টি সদস্য হিসেবে রয়েছেন শেখ রেহানার ছেলে রাদওয়ান মুজিব সিদ্দিক ববি।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেমোরিয়াল ট্রাস্টেও সম্পৃক্ত রয়েছেন শেখ হাসিনা, শেখ রেহানা, সজীব ওয়াজেদ জয় এবং সায়মা ওয়াজেদ পুতুল। প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংক হিসাবে বর্তমানে ১৬ কোটি ১২ লাখ ৫০ হাজার টাকার স্থিতি রয়েছে। এর লেনদেন সম্পর্কেও তদন্ত চলছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডেইলি মেইল গত সোমবার রাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, শেখ রেহানার মালিকানাধীন লন্ডনের একটি বাড়ি জব্দ করেছে দেশটির ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (NCA)। ভবিষ্যতে যেন ওই বাড়িটি বিক্রি করা না যায়, সে জন্য এটি প্রথম পর্যায়ে ফ্রিজ করা হয়েছে। বাড়িটি টিউলিপ সিদ্দিকের পরিবার গত ১৪ বছর ধরে প্রধান বাসভবন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ২০১১ সালে শেখ রেহানা এটি ১২ লাখ পাউন্ডে কিনেছিলেন, যার বর্তমান মূল্য বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২০ কোটি ২৮ লাখ।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ১৭ থেকে ২১ মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য সফর করেন। এ সময়ে তিনি দেশটির মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ ও দুর্নীতিবিরোধী সংস্থার সঙ্গে একাধিক বৈঠক করেন। এরপর যুক্তরাজ্যে পাচার করা বাংলাদেশিদের সম্পদের একটি তালিকা দেশটির কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং এসব নিয়ে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই দুর্নীতির তদন্ত ও পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সরকার ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম এখনো অব্যাহত রয়েছে।

