চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকায় এক বাসা থেকে ৩১৫ ফুট দীর্ঘ একটি সামরিক পোশাকসদৃশ কাপড় উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটে ২ মে। এরপর শুরু হয় তদন্ত। তদন্তে বেরিয়ে আসে ভয়ংকর এক গোপন তথ্য। চট্টগ্রামের দুটি পোশাক কারখানায় সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (কেএনএফ) জন্য মোটা টাকার বিনিময়ে তৈরি হচ্ছিল ইউনিফর্ম।
নগরীর বায়েজিদ ও পাহাড়তলী এলাকায় এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ হাজার ইউনিফর্ম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এই পোশাকগুলো তৈরি করছিল দুটি কারখানা—রিংভো অ্যাপারেলস ও নূর ফ্যাশন।
২০২২ সালের শুরুর দিকে বান্দরবানের রুমায় কেএনএফের অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে। এরপর ২০২৪ সালের এপ্রিলে তারা টানা কয়েকটি ব্যাংক ডাকাতি করে। এতে ব্যাপক আলোচনায় উঠে আসে সংগঠনটি। এরপর যৌথ বাহিনীর অভিযানে অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়। বন্দুকযুদ্ধে প্রাণহানিও ঘটে। এর পর দীর্ঘদিন সংগঠনটির কোনো বড় তৎপরতা দেখা যায়নি।
তবে এবার ইউনিফর্ম উদ্ধার হওয়ার পর আবারও আলোচনায় এসেছে কেএনএফ। পুলিশ বলছে, সংগঠনটি গোপনে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
২ মে সেনাবাহিনী ও পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালায় বায়েজিদের পশ্চিম শহীদনগরের তৈয়বা হাউজিংয়ের এক ভবনে। ভবনের চতুর্থ তলার একটি বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সামরিক পোশাকের মতো দেখতে এক রোল কাপড়।
পরদিন পুলিশ সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করে। এ মামলায় নুরুজ্জামান নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। পলাতক দেখানো হয় আরও তিনজনকে।
তদন্তে জানা যায়, ওই বাসা থেকে ৩১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের কাপড় ছাড়াও কেএনএফ ইউনিফর্মের টুকরো কাপড় এবং একটি সেলাই মেশিন উদ্ধার করা হয়েছে। সেলাই মেশিনটি ছিল ‘জেক’ কোম্পানির।
গ্রেপ্তার হওয়া নুরুজ্জামান পরিবারের সঙ্গে বাসাটি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। তিনি আগে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। তাঁর বাড়ি শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলায়।
১৩ মে চট্টগ্রামের মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নুরুজ্জামান জানান, গত ২০ এপ্রিল কুকি-চিনের দুই-চারজন সদস্য তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তারা একটি কাপড়ের রোল দিয়ে বলেন, এই কাপড় দিয়ে তাদের ইউনিফর্ম তৈরি করতে হবে। পরে ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে পোশাক তৈরির অর্ডার নেন তিনি।
বাসার মালিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “নুরুজ্জামান দুই-তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে এখানে থাকছেন। আগে পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন। এখন কী করেন, তা জানি না। তাঁর পরিবার এখনো বাসায় আছে।”
নুরুজ্জামানের স্বীকারোক্তির পর পুলিশ আরও অভিযান চালায়। ১৮ মে রাতে বায়েজিদ বোস্তামি থানার মোজাফফর নগরের রিংভো অ্যাপারেলস কারখানার গুদাম থেকে উদ্ধার করা হয় ১১ হাজার ২০০টি ইউনিফর্ম।
একই রাতে অক্সিজেন মোড়ের নয়াহাট এলাকার আরেকটি কারখানা থেকে উদ্ধার করা হয় ৯ হাজার ১০০টি ইউনিফর্ম।
পুলিশ জানায়, এই পোশাকগুলো তৈরি হচ্ছিল দুই কোটি টাকার চুক্তিতে। মার্চে মংলহাচিং মারমা নামের এক ব্যক্তি ইউনিফর্ম তৈরির জন্য কাপড় সরবরাহ করেছিলেন। মে মাসে ইউনিফর্মগুলো কেএনএফের কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।
এই ঘটনায় রিংভো অ্যাপারেলসের মালিক সাহেদুল ইসলাম, গোলাম আজম ও নিয়াজ হায়দারকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ ২৬ মে রাতে অক্সিজেন এলাকার একটি গুদাম থেকে উদ্ধার করে ১১ হাজার ৭৮৫টি ইউনিফর্ম।
এর পরদিন ২৭ মে পাহাড়তলী থানার নূর ফ্যাশন কারখানায় অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে উদ্ধার হয় আরও ১৫ হাজার ইউনিফর্ম। এ সময় গ্রেপ্তার করা হয় কারখানার মালিক আব্দুল মতিনকে।
পাহাড়তলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বাবুল আজাদ বলেন, বায়েজিদ থানার ইউনিফর্ম উদ্ধার মামলার তদন্ত করতে গিয়ে নূর ফ্যাশন কারখানার খোঁজ মেলে।
বিষয়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর হওয়ায় নগর পুলিশের কেউ এই বিষয়ে মুখ খুলছেন না।
বায়েজিদ থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মো. আরিফুল ইসলাম বলেন, “এই মামলায় একজন আসামি গ্রেপ্তার আছে। তিনি আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। বাকি আসামিদের ধরতে চেষ্টা চলছে।” তবে তিনি এ নিয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

