গত প্রায় ১৬ বছরে বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু সেই বিনিয়োগের সুফল রেলব্যবস্থার কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নে প্রতিফলিত হয়নি। বরং বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্নীতির মাত্রাও বেড়েছে উদ্বেগজনক হারে। রেলের ইঞ্জিন ও ট্রেন কেনা থেকে শুরু করে করোনাকালে সুরক্ষা সামগ্রী কেনার ক্ষেত্রেও দুর্নীতি হয়েছে। মেগা প্রকল্পের নামে ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ লোপাটের ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার।
প্রতিটি সময়কালেই দায়িত্বপ্রাপ্ত রেলমন্ত্রীদের মধ্যে কেউ কেউ দুর্নীতির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে ছিলেন না। তাঁদের অনিয়মের চাপে রেল অব্যবস্থার রেললাইনে লাইনচ্যুত হয়ে পড়েছে। রেলপথ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১৬ বছরে রেলের উন্নয়নে প্রায় তিন লাখ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে শেষ হওয়া ৯৫টি প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় সোয়া লাখ কোটি টাকা। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র থেকে নিয়োগ, বদলি, ইজারা সব ক্ষেত্রেই দুর্নীতি চলে। রেলের সর্বস্তরে এ দুর্নীতির ভাগ ভাগাভাগি হয়েছে ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত।
কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া মো. মুজিবুল হক রেলমন্ত্রী হওয়ার পর দ্রুতই বিলাসী জীবনযাপন শুরু করেন। এমনকি ৬৭ বছর বয়সেও বিয়ে করেন তিনি। পরবর্তীতে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নূরুল ইসলাম সুজন, যিনি মন্ত্রিত্বকালে সম্পদ বৃদ্ধির পাশাপাশি দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী পরবর্তীতে রেলের বিভিন্ন প্রকল্পে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের শেষদিকে দায়িত্ব পাওয়া রেলমন্ত্রী মো. জিল্লুল হাকিম দায়িত্ব নেওয়ার সাত মাসের মধ্যেই গড়ে তোলেন দুর্নীতির একটি সংঘবদ্ধ চক্র। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যমতে, এই তিন মন্ত্রীর দায়িত্বকালে বন্ধ হয়ে যায় ৯৩টি ট্রেন। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ইঞ্জিন বিকলের কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয় যথাক্রমে ২০৩ এবং ২৭৩ বার।
দুর্নীতির ভারে জর্জরিত রেলওয়েতে লোকসান বাড়ছেই। পাশাপাশি, দক্ষ নেতৃত্বের অভাব ও স্বচ্ছতা সংকটের কারণে খাতটির কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি ব্যাহত হয়েছে। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সম্প্রতি জানান, “বাংলাদেশ রেলওয়েতে এক টাকা আয় করতে খরচ হয় আড়াই টাকা। এর কারণ হলো দুর্নীতি ও অপচয়। এই অপচয় কমাতে আমরা কার্যকর উদ্যোগ নিচ্ছি।”
রেল খাতের অনিয়ম-দুর্নীতির পেছনে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব বড় কারণ বলে মনে করেন সাবেক মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান। তাঁর মতে, বারবার মন্ত্রী পরিবর্তন হলেও অনিয়ম-দুর্নীতির চক্র অটুট থেকেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রেলপথ মন্ত্রণালয় চালিয়েছেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, ওবায়দুল কাদের, মো. মুজিবুল হক, মো. নূরুল ইসলাম সুজন এবং মো. জিল্লুল হাকিম। এর মধ্যে মুজিবুল হক ও সুজন দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করেছেন।
রেল মন্ত্রণালয় গঠিত হয় ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর। এরপর ২০১২ সাল থেকে একের পর এক মেগাপ্রকল্প হাতে নেওয়া শুরু হয়। ওই বছর ডিসেম্বরে রেলমন্ত্রী হন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। তিনি রেলে ‘কালো বিড়াল’ থাকার কথা রসিকতা করে বললেও, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর এপিএস ও আরও দুই কর্মকর্তা নিয়োগ বাণিজ্যের ৭০ লাখ টাকাসহ গ্রেপ্তার হন। ফলস্বরূপ, সুরঞ্জিত ২০১২ সালের ১৬ এপ্রিল পদত্যাগ করেন। তিনি ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
এরপর দায়িত্ব পান মো. মুজিবুল হক। ২০১২ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তাঁর মেয়াদে নেওয়া অধিকাংশ প্রকল্পেই ব্যয় বাড়ানো হয় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে। চট্টগ্রামের দোহাজারী-কক্সবাজার, পাবনা-ঈশ্বরদী-ঢালারচরসহ বিভিন্ন প্রকল্পের ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। দোহাজারী-কক্সবাজার প্রকল্পের ব্যয় ১ হাজার ৮০০ কোটি থেকে বেড়ে হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা। ১৪টি প্রকল্প নেওয়া হয় কোনো ধরনের সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই। এ সময়েই মুজিব ৬৭ বছর বয়সে হনুফা আক্তার রিক্তাকে বিয়ে করেন, যাঁর নামে পরবর্তীতে বিপুল সম্পদ অর্জনের প্রমাণ পাওয়া যায়। নির্বাচনী হলফনামায় তাঁদের বার্ষিক আয় ও সম্পদের পরিমাণও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। মুজিব ও তাঁর স্ত্রীর নামে ফ্ল্যাট, বাড়ি, হোটেল, ফিলিং স্টেশন এবং বিলাসবহুল গাড়ির মালিকানা অর্জিত হয়।
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মুজিবুল হক ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয় বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুটি মামলা করে। মুজিবুল হকের বিরুদ্ধে সাত কোটি ৩৯ লাখ টাকার সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়, যা তাঁর আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ। স্ত্রী হনুফার বিরুদ্ধে তিন কোটি ২৮ লাখ টাকার সম্পদের অভিযোগ আনা হয়।
২০১৯ সালে রেলমন্ত্রীর দায়িত্ব পান নূরুল ইসলাম সুজন। তাঁর আমলে নেওয়া নানা প্রকল্প ও সিদ্ধান্ত দুর্নীতির জালে আটকে পড়ে। ঢাকায় বুলেট ট্রেন প্রকল্পের জন্য ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। পঞ্চগড়ের নিজ নির্বাচনী এলাকায় পাঁচটি নতুন ট্রেন চালু করেন, অন্যদিকে বন্ধ করে দেন অন্যান্য অঞ্চলের ট্রেন। মুজিব বর্ষে কোচ সংস্কারের নামে ২০০ কোটি টাকার প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি হয়। তাঁর সময়েই টেন্ডার ছাড়াই সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হয়। রেলের ২১ জন কর্মকর্তা এ দুর্নীতিতে জড়িত থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে অনেককেই পদোন্নতি দেন তিনি। টিকিট বিক্রির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ‘সহজ ডটকম’ এর নানা অনিয়মও উপেক্ষিত ছিল। তমা কনস্ট্রাকশন ও ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে কাজ দেওয়া হয়, যাঁদের সঙ্গে সুজন ও আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। সুজনের স্ত্রী শাম্মী আখতারও বিভিন্ন ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর এক মামলায় সুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সবশেষে, ২০২৪ সালের ১১ জানুয়ারি রেলমন্ত্রী হন রাজবাড়ীর এমপি জিল্লুল হাকিম। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির চক্র গড়ে তোলেন। অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি, নিয়োগ, বদলি এবং রেলের সম্পত্তি দখলসহ বিভিন্ন অনিয়মে তিনি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা জড়িত। দুদক অনুসন্ধানে জানিয়েছে, তাঁর মালিকানাধীন রয়েছে বনানী ও উত্তরা এলাকায় বাড়ি, রাজবাড়ীতে ৭০০ বিঘা জমি এবং ঢাকায় অর্চার্ড হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টসহ আরও সম্পত্তি। তাঁর বিরুদ্ধে তিন হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুদক মামলা করেছে। এই মামলায় শুধুমাত্র জিল্লুল হাকিমের নামেই ২৪ কোটি ২৯ লাখ টাকার অবৈধ সম্পদের প্রমাণ মিলেছে।

