ছয় লাখ টাকা খরচ করে মালয়েশিয়ার ভিসা নিয়েছিলেন নওগাঁর যুবক সাব্বির আহমেদ। আশা ছিল বিদেশে কাজ করে ঘুরিয়ে দেবেন ভাগ্যের চাকা। সব প্রস্তুতি শেষ হলেও শেষ মুহূর্তে আর যাওয়া হয়নি। বিমানের টিকিট না পাওয়া, নানা জটিলতা—সব মিলিয়ে স্বপ্নভঙ্গ। এখন তিনি এক রেস্টুরেন্টে ওয়েটার হিসেবে কাজ করছেন। কষ্ট করে পরিশোধ করছেন ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি।
শুধু সাব্বিরই নন, একই অভিজ্ঞতা দিনাজপুরের মহসিন হোসেনেরও। তিনিও মালয়েশিয়া যাওয়ার আশায় বিক্রি করেছিলেন ফসলি জমি। খরচ করেন সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। কিন্তু প্রবাসযাত্রা হয়নি বাস্তব। এখন দেনার চাপে বাড়ি ফেরা বন্ধ রেখেছেন প্রায় এক বছর। বারবার ধর্ণা দিলেও কোনো দপ্তর থেকে ফেরত পাননি অর্থ।
২০২৪ সালের ৩১ মে বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। এরপর বহু কর্মী আন্দোলন করেও সমাধান পাননি। ভিসা পাওয়ার পরও অন্তত ১৭ হাজার কর্মী যেতে পারেননি মালয়েশিয়ায়। এখন তারা চরম হতাশায় ভুগছেন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগস্টে শ্রমবাজার চালু হওয়ার পর মালয়েশিয়ায় গেছেন ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৬৭২ জন। তবে অনেকে যেতে পারেননি বিমানের টিকিট না পাওয়া, রিক্রুটিং এজেন্টদের গাফিলতি এবং নানা অনিয়মের কারণে।
সরকার আবার উদ্যোগ নিয়েছে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো চালু করতে। গত ১৪ মে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল ও প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী। এই বৈঠকে নতুন আশার আলো দেখা দেয়।
বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে কোন খাতে কত কর্মী যাবে।
তবে এখানেও ফিরে এসেছে ‘সিন্ডিকেট’ প্রসঙ্গ। অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কারণে কর্মীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অবৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালদের কারণে আগেও সমস্যায় পড়েছেন অনেক কর্মী।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মালয়েশিয়াকে ঘিরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা সবসময় তিক্ত। রামরু চেয়ারপারসন তাসনিম সিদ্দিকীর মতে, সিন্ডিকেট রেখে শ্রমবাজার চালু করলে কোনো স্থায়ী সমাধান আসবে না।
এই প্রেক্ষাপটে ২১ ও ২২ মে ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয় তৃতীয় বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের সভা। বৈঠকে মালয়েশিয়ার ১৪ সদস্যের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনা করেন বাংলাদেশি কর্মকর্তারা। বৈঠক শেষে নির্ধারিত সংবাদ সম্মেলন বাতিল করা হয় “অনিবার্য কারণে”।
তবে বৈঠকের শুরুতেই বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী বলেন, নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায় সরকার। অনিয়ম ও বৈষম্যের কোনো সুযোগ থাকবে না বলেও জানান তিনি।
এর আগে ড. আসিফ নজরুল মালয়েশিয়ায় গিয়ে বৈঠক করেন দেশটির মানবসম্পদ মন্ত্রী স্টিভেন সিম চি কেওয়ংয়ের সঙ্গে। সেখানে মন্ত্রী জানান, কর্মী নেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দেবে মালয়েশিয়া। প্রথম ধাপে ৭ হাজার ৯২৬ জন কর্মী নেওয়ার বিষয়টিও চূড়ান্ত হয়েছে বলে ভিডিও বার্তায় জানান উপদেষ্টা।
এদিকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন ‘বায়রা’-এর অভ্যন্তরীণ বিরোধ বাড়ছে। ১৯ মে ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে সিন্ডিকেটবিরোধী পক্ষের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে সংগঠনেরই আরেকটি অংশের বিরুদ্ধে।
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, সিন্ডিকেটের কারণেই শ্রমবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তার ভাষায়, কর্মীপ্রতি খরচ নির্ধারিত ছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। অথচ গড়ে খরচ হয়েছে সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। তিনি মনে করেন, কম খরচে কর্মী পাঠাতে হলে সিন্ডিকেট বন্ধ করতেই হবে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, কেন মালয়েশিয়া ঠিক করবে কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাবে? আর এই প্রশ্ন তোলাতেই সংবাদ সম্মেলনে হামলা হয়েছে বলে অভিযোগ তার।
তবে বায়রার সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আবুল বাশার সিন্ডিকেট ইস্যুকে ভিত্তিহীন বলছেন। তার দাবি, দুই দেশের সমঝোতার ভিত্তিতেই শ্রমবাজার চলে। সরকারের নিয়ন্ত্রণ থাকলে বাজার স্থিতিশীল থাকে। তার মতে, একটি পক্ষ বেশি সুবিধা পেতেই সিন্ডিকেট প্রসঙ্গ সামনে আনছে। এর ফলে অতীতেও শ্রমবাজার হারিয়েছে বাংলাদেশ।
মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ইতিহাস নানা ঘাত-প্রতিঘাতে জর্জরিত। ২০১৫ সালে ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নেওয়া শুরু করে মালয়েশিয়া। তখন ‘সিন্ডিকেট’ নামেই পরিচিত হয় এই পদ্ধতি। দুর্নীতির অভিযোগে পরে এটি বন্ধ করে দেয় মাহাথির মোহাম্মদের সরকার।
২০২২ সালের আগস্টে আবার শ্রমবাজার খুললেও সব এজেন্সির জন্য তা উন্মুক্ত হয়নি। প্রথমে অনুমোদন দেওয়া হয় ২৫টি এজেন্সিকে, পরে ১০০টি। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনে মালয়েশিয়ায় একটি প্রভাবশালী বেসরকারি এজেন্সি চক্র কাজ করেছে।
অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার কখনোই স্থায়ী ছিল না। ১৯৯২ সালে প্রথম চুক্তির কিছুদিন পরই তা বন্ধ হয়। ১৯৯৬ সালে চালু হলেও ২০০০ সালে আবার সীমিত হয়। ২০০৬ সালে চালু হলেও ২০০৯ সালে বন্ধ হয় অবৈধ কর্মীর কারণে।
২০১২ সালে আবার ‘জিটুজি’ পদ্ধতির মাধ্যমে চুক্তি হয়। পরে ২০১৫ সালে ১০টি এজেন্সির মাধ্যমে শুরু হলে ফের সিন্ডিকেট বিতর্কে তা বন্ধ হয় ২০১৮ সালে।
২০২১ সালের ডিসেম্বরে নতুন সমঝোতা হলেও মালয়েশিয়া কেবল ২৫টি এজেন্সি দিয়ে কর্মী নিতে চায়। বাংলাদেশ সরকার এতে আপত্তি জানায়। ফলে দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে চলে চিঠি চালাচালি।
২০২২ সালের ২ জুন ঢাকায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশ ১৫৬১টি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দেয়। এরপর মালয়েশিয়া সেখান থেকে ১০১টি এজেন্সিকে অনুমোদনের প্রক্রিয়া শুরু করে।
শেষ আলোচনায় নতুন সম্ভাবনার কথা শোনা গেলেও পুরনো অনিয়ম, সিন্ডিকেট আর দায় এড়ানোর সংস্কৃতি থেকে বের না হলে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার থেকে যাবে এক বিভ্রমে। লাখ লাখ টাকা খরচ করে যারা বিদেশে স্বপ্ন খুঁজছেন, তাদের সেই স্বপ্ন যেন বারবার হতাশায় না ভেঙে পড়ে—এটাই এখন বড় প্রত্যাশা।

