নাটোরের গুরুদাসপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) আবু জাফর মৃধাকে মোবাইল ফোনে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দাবির অভিযোগে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, এক মারামারি মামলায় যুক্ত থাকা একজন আমেরিকা প্রবাসীর নাম বাদ দেওয়ার বিনিময়ে তিনি এই ঘুষ দাবি করেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর জেলা পুলিশ কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
বুধবার (৪ জুন) সকালে নাটোরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন সাংবাদিকদের জানান, এই অভিযোগ পাওয়ার পরই তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় এবং প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এরপর রাতেই এসআই আবু জাফরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পাশাপাশি তাকে গুরুদাসপুর থানা থেকে প্রত্যাহার করে নাটোর পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর। সেই অডিও ক্লিপে শোনা যায়, এক ব্যক্তির সঙ্গে ফোনালাপে এসআই আবু জাফর বলেন, মামলা থেকে নাম বাদ দিতে পাঁচ লাখ টাকার নিচে হবে না। আপনি জানেন, চার-পাঁচটা দপ্তরে টাকা দিতে হবে। আমি তো একা নাম কাটতে পারবো না। নাম বাদ দিতে গেলে এসপি স্যার, সার্কেল স্যার, ওসি স্যার আমাকে ডাকতে পারে। ঈদের আগে আপাতত এক লাখ টাকা দিবেন।” কথোপকথনের অন্য একটি অংশে তাকে আরও বলতে শোনা যায়, “মনে করেন একবারেও টাকা দিতে পারেন। কত টাকা দিতে পারবেন বলেন। হবে তো হবে, না হলে নাই।”
এ ঘটনায় মঙ্গলবার দুপুরে নাটোরের পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন গোলাম রাব্বি নামের এক ব্যক্তি, যিনি ওই ফোনালাপে এসআই আবু জাফরের সঙ্গে কথা বলছিলেন। তিনি গুরুদাসপুর পৌরসভার আনন্দ নগর মহল্লার বাসিন্দা এবং প্রবাসী রাসেল হোসাইনের দোকানের ম্যানেজার। গোলাম রাব্বি জানান, কয়েকদিন ধরে এসআই আবু জাফর তাকে ভয়ভীতি দেখাচ্ছিলেন। সবশেষ সোমবার বিকেল ও রাতে দুই দফায় পাঁচ মিনিটের মতো তাদের মধ্যে ফোনালাপ হয়, যেখানে ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর তিনি কৌশলে সেই কথোপকথন রেকর্ড করে প্রমাণসহ জেলা পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ জমা দেন।
প্রবাসী রাসেল হোসাইন নাটোর জেলার গুরুদাসপুর উপজেলার ধারাবারিষা ইউনিয়নের খাকড়াদহ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলহাজ রবিউল করিমের ছেলে। দীর্ঘদিন ধরে তিনি আমেরিকায় বসবাস করছেন। দেশে তার মালিকানাধীন একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে গুরুদাসপুর পৌরসভার চাঁচকৈড় বাজারে ‘রাশ আবরান স্টাইল শপিং মল’ নামের একটি দোকান, যেখানে গোলাম রাব্বি ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত।
জানা গেছে, পুরনো দ্বন্দ্বের জেরে সম্প্রতি রুবেল নামের এক ব্যক্তিকে মারধরের ঘটনা ঘটে, যিনি প্রবাসী রাসেলের বন্ধু। এই ঘটনায় রুবেলের বাবা ফরিদ মোল্লা রাসেলকে প্রধান আসামি করে গুরুদাসপুর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটির তদন্তভার পান এসআই আবু জাফর মৃধা।
মারামারির ঘটনার সঙ্গে নিজের কোনো সম্পৃক্ততা নেই দাবি করে রাসেল হোসাইন বলেন, “আমি বিদেশে থেকেও দেশে দায়ের হওয়া একটি মামলার প্রধান আসামি হয়ে গেছি। অথচ মামলা থেকে নাম বাদ দিতে পুলিশ কর্মকর্তা ঘুষ দাবি করছেন। একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসেবে এ ধরনের ঘুষের প্রস্তাব আমার জন্য লজ্জাজনক ও দুঃখজনক।” তিনি তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
ঘুষ দাবির অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই আবু জাফর মৃধা বলেন, “আমি কাউকে মামলার নাম কাটার জন্য টাকা চাইনি। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন। এ বিষয়ে গুরুদাসপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আসমাউল হক বলেন, বিষয়টি নিয়ে পুলিশ সুপারের সঙ্গে কথা বলাই ভালো হবে। তিনি বলেন, অডিও ক্লিপে নিজের নাম উঠে আসা সম্পর্কে তার কিছু বলার নেই।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আমজাদ হোসাইন বলেন, এ ঘটনায় অভিযুক্ত পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। সাময়িক বরখাস্তের এই সিদ্ধান্ত পুলিশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ঘুষ ও দুর্নীতির মতো অভিযোগে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

