ঈদুল আজহা আর মাত্র দুদিন পর। রাজধানীসহ সারা দেশের কোরবানির পশুর হাটগুলোতে ভিড় জমেছে ক্রেতা বিক্রেতার। সাধ্য অনুযায়ী পছন্দের পশু কিনছেন ক্রেতারা, আবার বিক্রেতারাও শখের পশুটি বিক্রি করছেন এক বড় ত্যাগ স্বীকার করে। কিন্তু প্রতি বছর কোরবানির পশুর হাটকে কেন্দ্র করে প্রতারণা ও অপরাধ চক্রের দৌরাত্ম্য বাড়ে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে জাল নোট, অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টির মতো সংঘবদ্ধ অপরাধীদের তৎপরতা।
বিশেষ করে কোরবানির ঈদের সময় পশুর হাট ও মার্কেটগুলোকে টার্গেট করে সক্রিয় হয়ে ওঠে জাল নোটের কারবারিরা। সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা এসব চক্র বাসা-বাড়িতে ছোট আকারের প্রিন্টার ও কম্পিউটারের মাধ্যমে তৈরি করছে চমকপ্রদ দক্ষতায় হুবহু আসল টাকার মতো দেখতে জাল নোট। শুধু ৫০০ ও ১ হাজার টাকার নোটই নয়, এখন ২০০ ও ৫০ টাকার নোটও জাল করে বাজারে ছাড়ছে তারা। এ কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে বিশেষ সফটওয়্যার ও অ্যাপ। এমনকি কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিচ্ছে এই জাল টাকা। অপরাধীদের এই তৎপরতায় যোগ দিয়েছেন নতুন নতুন সদস্য ও কিছু অসাধু আইনজীবী, যারা মোটা অঙ্কের বিনিময়ে তাদের জামিনের ব্যবস্থা করে দেন। ফলে এদের মধ্যে কেউ কেউ ধরা পড়লেও পুরোপুরি নির্মূল করা যাচ্ছে না।
সম্প্রতি রাজধানীর পল্টন থানাধীন গুলিস্তান শপিং কমপ্লেক্সের সামনে অভিযান চালিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ ১ লাখ টাকার জাল নোটসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মো. সাগর (৩০), আল আমিন হাওলাদার (২৮) ও বাবু মাতব্বর (৫৪)। ডিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন এলাকায় দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে জাল নোট সরবরাহ করছিল এবং ঈদ সামনে রেখে বড় ধরনের জালিয়াতির পরিকল্পনা করছিল। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।
এর আগেও গত ১৬ মে ওয়ারীর একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে মো. সাইদুর রহমান (৩২) ও মো. মেহেদী হাসান (২৫) নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে ৩৮ লাখ ৫২ হাজার ৬০০ টাকার জাল নোট, ৭৭ হাজার ১০০ টাকার জাল ভারতীয় রুপি, একটি সিপিইউ, মনিটর, প্রিন্টার ও জাল নোট তৈরির নানা উপকরণ জব্দ করা হয়। গ্রেপ্তারকৃতদের স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে তারা বিপুল পরিমাণ জাল নোট তৈরি করে রেখেছিল, যা দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহের পরিকল্পনা ছিল।
তবে জাল টাকার কারবারিরা একা নয়। ঈদ সামনে রেখে সক্রিয় হয়ে উঠেছে আরও নানা ধরনের অপরাধী চক্র। ছিনতাইকারী, ডাকাত, চাঁদাবাজ, মলম পার্টি, অজ্ঞান পার্টি, অপহরণকারী চক্র, টানা পার্টি এবং মাদক ব্যবসায়ীরাও ঈদ মৌসুমকে লক্ষ্য করে তাদের তৎপরতা জোরদার করেছে। এই অপরাধীরা সাধারণত গণপরিবহন, শপিংমল, ব্যাংকপাড়া, নির্জন সড়ক ও কোরবানির হাটের আশপাশে সক্রিয় থাকে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের চোখ ফাঁকি দিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই লুটে নিচ্ছে অর্থ ও মূল্যবান জিনিসপত্র।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোরবানির ঈদে গরু কেনা-বেচায় এবং কেনাকাটায় অনেক বড় অঙ্কের লেনদেন হয়। ফলে হাট ও মার্কেটগুলো ছিনতাইকারীদের জন্য প্রিয় টার্গেট হয়ে দাঁড়ায়। এজন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীতে চার শতাধিক ছিনতাই স্পট চিহ্নিত করে সেখানে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। জামিনে মুক্ত থাকা অপরাধীদের ওপরও বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) এসএন মো. নজরুল ইসলাম জানিয়েছেন, ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর শপিংমল, মার্কেট, পশুর হাট ও ব্যাংক এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ও জাল টাকার বিরুদ্ধে ডিবি ও থানা পুলিশ বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। তার আশা, পুলিশের তৎপরতায় এসব মৌসুমি অপরাধীরা আইনশৃঙ্খলার আওতায় আসবে। র্যাবও এ সময়টিকে ঘিরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। মঙ্গলবার রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর হাট, ঈদের জামাত, চামড়া বেচাকেনাসহ নানা কার্যক্রম চলে। এতে জাল টাকার ব্যবহার ও অন্যান্য অপতৎপরতা রুখতে র্যাব সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নিয়েছে। হাটগুলোতে র্যাবের কন্ট্রোল রুমে জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন বসানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রতারক চক্র, দালাল, ছিনতাইকারী, মলম পার্টি ও অজ্ঞান পার্টি ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
র্যাব-৪ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মাহবুব আলম গাবতলী পশুর হাট নিরাপত্তা নিয়ে বলেন, ঘরমুখো মানুষ যেন নিরাপদে ঈদযাত্রা করতে পারে সেজন্য গাবতলী বাসস্ট্যান্ড, নবীনগর, বাইপাইল, ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক এবং ফেরিঘাট এলাকায় নিয়মিত টহল চলছে। টিকিট কালোবাজারি, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের মতো অপরাধ রোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে।
সর্বোপরি, কোরবানির ঈদ সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর পক্ষ থেকে রাজধানীসহ সারা দেশে বাড়ানো হয়েছে নজরদারি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জনসচেতনতা এবং পুলিশের সমন্বিত পদক্ষেপে আশা করা যায়, ঈদ আনন্দে ভাটা না পড়ে বরং তা হোক নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন।

