চট্টগ্রাম মহানগরের উত্তর কাট্টলী থেকে শুরু করে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি এলাকা জুড়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অন্তত ৩২ একর জমি দীর্ঘদিন ধরে দখল করে রেখেছেন একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি। দখলদারদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাসীন দলের সাবেক সংসদ সদস্য, স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিসহ নানা পর্যায়ের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতা।
এ জমিগুলো দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে কাভার্ডভ্যান ও এক্সক্যাভেটরের ডিপো, ডেইরি ফার্ম, ট্রলি ইয়ার্ড, গাড়ির গ্যারেজ এবং এমনকি বসবাসের জন্য কলোনিও। এসব স্থাপনায় ভাড়া দিয়ে প্রতিবছর আয় হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। অথচ এই জমিগুলোর মালিকানা এখনো রয়েছে সরকারেরই।
পাউবো সূত্র জানায়, ১৯৭২ সালে চট্টগ্রাম শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য সংস্থাটি ২ হাজার ৬৪২ একর জমি অধিগ্রহণ করে। এর মধ্যে একাংশে বাঁধ ও সংলগ্ন সড়ক নির্মাণ করা হলেও অধিকাংশ জায়গা ফাঁকা পড়ে থাকে। আর সেই সুযোগেই ধীরে ধীরে স্থানীয় প্রভাবশালীরা জায়গাগুলো দখল করে নেন এবং বানিজ্যিকভাবে ব্যবহার শুরু করেন।
উল্লেখযোগ্যভাবে, উত্তর কাট্টলীর সাগরপারের টোল রোডের পাশেই সাত একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে বিশাল এক কাভার্ডভ্যান ও এক্সক্যাভেটর ইয়ার্ড। এর মালিক সাবেক সংসদ সদস্য এবং আওয়ামী লীগ নেতা দিদারুল আলম। গত ১৬ বছর ধরে এই জমিতে অবৈধভাবে কাভার্ডভ্যান দাঁড় করিয়ে, গাড়ি ভাড়া দিয়ে বছরে তাঁর আয় হচ্ছে কোটি টাকারও বেশি। অথচ এই জমিটি সরকারি মালিকানাধীন এবং পাউবোর আওতাভুক্ত। তার দাবি, ক্ষমতার জোরে প্রায় ১০ কোটি টাকার সরকারি জমি দীর্ঘদিন ধরে দখলে রেখে পরিচালনা করছেন তিনি।
এভাবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক প্যানেল মেয়র নিছার উদ্দিন আহম্মেদ মঞ্জু দখল করেছেন আড়াই একর জমি। এসব জমি বছরের পর বছর ধরে বিভিন্ন ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর কাছে ভাড়া দিয়ে বছরে অর্ধকোটি টাকার বেশি আয় করছেন তিনি। দখলে থাকা জমির কিছু অংশ তিনি ভাড়া দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মুনছুর মিস্ত্রী, আরিফুর রহমান রুবেল, আবদুল মমিনসহ অনেকের কাছে, যাঁরা বছরে লাখ লাখ টাকা ভাড়া দিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চসিকের সাবেক কাউন্সিলর আবুল হাসেমও একই কায়দায় দশমিক ০১৬২ একর জায়গায় ট্রলি ডিপো গড়ে বছরে ১৮ লাখ টাকা আয় করছেন। শুধু তিনি নন, এভাবে ৩৯ জন প্রভাবশালী ব্যক্তি বর্তমানে পাউবোর ৩২০ কোটি টাকা মূল্যের ৩২ একর জমি দখল করে রেখেছেন।
সরেজমিন ৪ জুন হালিশহরের টোল রোড সংলগ্ন এলাকায় দেখা যায়, সাগরিকা স্টেডিয়ামের পাশে বিশাল একটি কাভার্ডভ্যান ইয়ার্ড গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে শতাধিক কাভার্ডভ্যান রাখা হয়েছে। চারপাশে সবুজ টিনের ঘেরা, কোনো সাইনবোর্ড নেই। কাছেই মোস্তফা হাকিম মিনি স্টেডিয়াম গড়ে তোলা হয়েছে ইটের দেয়াল ও লোহার গেট দিয়ে, যার পাশেই চায়না কোম্পানির কাছে ২ দশমিক ৭৫ একর জমি ভাড়া দেওয়া হয়েছে ১২ টাকা বর্গফুট হিসেবে। পাশাপাশি নুরুল হুদা চৌধুরীর দখলে থাকা সাত একর জায়গাজুড়ে রয়েছে আরও বড় আকারের কাভার্ডভ্যান ও এক্সক্যাভেটর ডিপো।
দক্ষিণ কাট্টলীতেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। এখানে এরশাদ উদ্দিন দুই একর জমি দখল করে ১২টি আধাপাকা ঘর নির্মাণ করেছেন এবং বছরে ১৫ লাখ টাকা ভাড়া পাচ্ছেন। তাঁর পাশে গোলাপুর রহমানের দখলে থাকা দুই একর জমি থেকে আয় হচ্ছে ৪৫ লাখ টাকা। আকরাম সিদ্দিক চৌধুরী দশমিক ৪৯ একর জমি দখলে রেখে এক্সক্যাভেটর ইয়ার্ড চালাচ্ছেন, যেখান থেকে বছরে আয় ১২ লাখ টাকা।
এভাবে হুমায়ুন কবির চৌধুরী, মোস্তফা হাকিম, আরাফাত হোসেন, মো. জুয়েল, মো. মোশারফ, কোরবান আলী, মোহাম্মদ আলী, লিটন মিয়া, ইলিয়াছ মিস্ত্রী, আবদুল জলিল, জামাল আহম্মদ, মো. রনি, মো. জনি, মো. নাছির, মো. হোসেন, মো. মনির, মো. ওয়াহিদ, নিজাম উদ্দিন মামুন, ওয়াহিদ, ওমর ফারুক, মিজানুর রহমান, মো. কামরুজ্জামান, জাহাঙ্গীর, মীর আহাম্মদ, জাকের মিস্ত্রী, জানে আলম বুলু এবং হাজি মো. শাহজাহানসহ অন্তত ৩৯ জন ব্যক্তি মিলে এ জমিগুলো দখল করে নানা ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন।
সরকারি জমির ওপর গড়ে তোলা হয়েছে ১৩টি বিশাল কাভার্ডভ্যান ইয়ার্ড, ১০টি গাড়ির গ্যারেজ ডিপো, তিনটি ট্রলি ইয়ার্ড, তিনটি ডেইরি ফার্ম এবং চারটি কলোনি। এদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পাউবো চট্টগ্রাম বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে সাহীদ জানিয়েছেন, এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে সরকারকে ১২ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
অভিযুক্ত সাবেক এমপি দিদারুল আলম ও চসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র নিছার উদ্দিন আহম্মেদ মঞ্জুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা সাড়া দেননি।
অবশ্য দখলদারদের অনেকেই দাবি করেছেন, এসব জমি তাঁদের পূর্বপুরুষদের ছিল এবং অধিগ্রহণের সময় তারা সম্পূর্ণ অর্থ পাননি। আকরাম সিদ্দিক চৌধুরী বলেন, “এগুলো আমাদের বাপ-দাদার জায়গা। পাউবো কিছু জায়গা অধিগ্রহণ করলেও সব টাকাপয়সা দেয়নি।
কাজেই দখলে থাকা সবই আমাদের নিজস্ব সম্পত্তি।” একই দাবি করেন এসএ করপোরেশনের মো. মোশারফ ও হাজি মো. শাহাজাহানও। তাঁদের মতে, সরকার জমি অধিগ্রহণ করলেও কার্যত কোনো উন্নয়ন কাজ না করায় ফাঁকা পড়ে থাকা জমিতে তাঁরা ব্যবসা করছেন এবং এতে দোষের কিছু নেই। গোলাপুর রহমান বলেন, “সরকার জমি অধিগ্রহণ করেছে, কিন্তু কাজে লাগায়নি। তাহলে সে জমি আমরা ব্যবহার করলে ক্ষতি কী?”
এই দখলদারিত্ব ও অবৈধ ব্যবসা এখন চট্টগ্রামের অন্যতম একটি উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে উঠেছে। সরকারি জমি দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা এবং সেখান থেকে প্রভাবশালীদের কোটি টাকার আয় যেমন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরে, তেমনি এটি নাগরিক অধিকার ও নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে। এখন দেখার বিষয়, সরকার এসব জমি পুনরুদ্ধারে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে।

