শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই একে একে বেরিয়ে আসছে সাবেক এমপি-মন্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনদের নানা দুর্নীতির চিত্র। এবার আলোচনায় উঠে এসেছেন দীর্ঘদিন শেখ হাসিনার বাসার বাবুর্চির দায়িত্ব পালন করা মো. মোশারফ শেখ। সাধারণ এক হোটেল বাবুর্চি থেকে কয়েক কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া এই ব্যক্তিকে ঘিরে জমি দখল, নিরীহ মানুষকে হয়রানি ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ তুলেছেন তার নিজ এলাকার বাসিন্দারা।
ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ভাওয়াল ইউনিয়নের বড় কামদিয়া গ্রামের সন্তান মোশারফ শেখ। পেশায় দিনমজুর বাবা-মার সন্তান এই ব্যক্তি প্রায় ৩০ বছর আগে বাবুর্চি পেশা দিয়ে জীবন শুরু করেন। ১৯৯৬ সালে ভাগ্যক্রমে শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত বাসার বাবুর্চির চাকরি পান তিনি। এরপর থেকেই তার জীবনে শুরু হয় দৃশ্যমান পরিবর্তন। বাবার সম্পত্তি থেকে মাত্র ৫ শতাংশ জমির অংশ পেয়েছিলেন মোশারফ। অথচ এখন তিনি একাধিক বাড়ি, জমি, গাড়ি ও শহরে ফ্ল্যাটের মালিক।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি দেখিয়ে নিজ এলাকায় জমি দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে জমি দখলের একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন বড় কামদিয়া গ্রামের কৃষক মো. চাঁনমিয়া ফকিরের ছেলে সাগর মিয়া। অভিযোগে বলা হয়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মোশারফ বড় কামদিয়া ৮১ নম্বর মৌজার ৬১৮ নম্বর দাগের ৪৩ শতাংশ জমি জোরপূর্বক দখল করে বাড়ি নির্মাণ করেন। জমি ছেড়ে দিতে বললে তিনি চাঁনমিয়াকে হুমকি দেন, এমনকি মারধর করে এলাকাছাড়া করেন।
গত ১ জুন জমি উদ্ধার চেষ্টায় গেলে চাঁনমিয়ার পরিবারকে ফের হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাগর মিয়া। চাঁনমিয়ার ভাতিজা সেন্টু ফকির জানান, দখলকৃত জমির ওপর মোশারফ পাকা ঘর নির্মাণ করেছেন। ওই ঘরের ছাদে নৌকা টানিয়ে রাখার মতো বর্ণিল অবকাঠামো নির্মাণও করেছেন তিনি। পুলিশের কাছে অভিযোগ করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাবুর্চির চাকরি পেয়ে মোশারফ যেন গ্রামে ক্ষমতার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের ওপর চালিয়েছেন দমন-নিপীড়ন।
মোশারফের প্রতিবেশী মো. জামাল শেখ বলেন, “হাসিনার বাবুর্চি হওয়ার পর মোশারফ যেন আলাদিনের চেরাগ পেয়ে যান। কামদিয়ায় তার বাড়ি রয়েছে ২ বিঘা জমির ওপর। মাঠেও আছে আরও ৩ বিঘা জমি। ফরিদপুর শহরের হাড়োকান্দি এলাকায় ১২ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি এবং রাজবাড়ী রাস্তার মোড় এলাকায় ৮ শতাংশ জমির ওপর আরেকটি বাড়ি গড়েছেন তিনি। এছাড়াও ফরিদপুর ও ঢাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, প্লট এবং ব্যক্তিগত গাড়ি রয়েছে তার মালিকানায়। স্থানীয়রা বলছেন, এই সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করা হলে আরও বিস্ময়কর তথ্য সামনে আসবে। গোয়েন্দা সংস্থা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে কার্যকর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগের বিষয়ে মোশারফের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে এবং বাড়িতেও কাউকে পাওয়া যায়নি।
এ বিষয়ে সালথা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতাউর রহমান জানান, জমি দখলের অভিযোগ পেয়েছেন তারা। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।
বর্তমানে শেখ হাসিনার দেশত্যাগ ও সরকার পতনের প্রেক্ষাপটে এই ধরনের অভিযোগ নতুন করে সাধারণ মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। একজন বাবুর্চির এমন অস্বাভাবিক সম্পদ অর্জন ও ক্ষমতার অপব্যবহারকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা অন্যদের বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠেছে। এখন দেখার বিষয়—এই অভিযোগগুলো কতটা তদন্ত হয় এবং এর ভিত্তিতে কি কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

