গত ১৬ বছরে অতিরিক্ত পাঠ্যবই ছাপানোর নামে সরকারের প্রায় ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে। প্রতি বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়িয়ে দেখিয়ে অতিরিক্ত বইয়ের চাহিদা তৈরি করে তা কালোবাজারে বিক্রির মাধ্যমে গড়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটে জড়িত ছিলেন উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকরা। ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিটি বছরই পাঠ্যবইয়ের সংকট দেখা গেছে, যার সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট সক্রিয়ভাবে কাজ করেছে।
এ অবস্থায় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের জন্য কঠোর নজরদারি শুরু করে। ফলে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের তুলনায় এবার প্রায় সাড়ে ৪ কোটি বইয়ের চাহিদা কমে গেছে। এতে সরকারের প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে। এনসিটিবির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পূর্বের বছরগুলোতে প্রতি বছর ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় হতো। এবার পাঠ্যবইয়ের চাহিদা তৈরির ক্ষেত্রে এনসিটিবি তিন ধাপের যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে। প্রথমে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চাহিদা পাঠানোর সময় সতর্ক থাকতে বলা হয়। অতিরিক্ত চাহিদার প্রমাণ মিললে শিক্ষকদের এমপিও স্থগিতসহ শাস্তির হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। দ্বিতীয় ধাপে মাঠ থেকে আসা তথ্য শিক্ষাবোর্ডের উপাত্তের সঙ্গে মেলানো হয়। তৃতীয় ধাপে এনসিটিবির নিজস্ব অ্যাপের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে একাধিকবার যাচাই করা হয়। একইসঙ্গে ৩২টি বিশেষ টিম সারা দেশে মাঠপর্যায়ে মিটিং করে সতর্ক বার্তা দিয়েছে।
এমন নজরদারির ফলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষা কর্মকর্তারা এবার যথেষ্ট সতর্ক ছিলেন। ফলে গত বছরের তুলনায় প্রায় সাড়ে ৪ কোটি বইয়ের চাহিদা কম এসেছে। এনসিটিবির তথ্য মতে, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ের জন্য মোট সাড়ে ৩৯ কোটি বই ছাপানো হয়েছে। এর মধ্যে মাধ্যমিকে ৩০ কোটি ৪০ লাখ এবং প্রাথমিক স্তরে ৯ কোটি ১৯ লাখ ৫৪ হাজার বই ছাপানো হয়েছে। বিশেষভাবে দশম শ্রেণির জন্য নতুন পাঠ্যক্রম অনুযায়ী ৫ কোটি ২০ লাখ বই আলাদাভাবে ছাপা হয়েছে, যা আগামী বছর আর ছাপানো হবে না।
মাধ্যমিকে আগামী বছরের জন্য ৩ কোটি ৮০ লাখ বইয়ের চাহিদা কমে এসেছে। প্রাথমিকেও প্রায় ৭০ লাখ বই কম চাওয়া হয়েছে। নবম ও দশম শ্রেণির বই ছাপতে গড়ে প্রতিটি বইয়ের জন্য ৬০ টাকা খরচ হয়। সেই হিসেবে শুধুমাত্র মাধ্যমিক পর্যায়ে আগামী বছর প্রায় ২০০ কোটি টাকা এবং প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকা খরচ কম হবে।
অবশ্য এনসিটিবির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরীর সঙ্গে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বোর্ডের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চাহিদা নির্ধারণে এবার এনসিটিবি অধিকতর সতর্ক ছিল এবং অনলাইনে সভার মাধ্যমে সংশ্লিষ্টদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে চাহিদার তুলনাও মিলিয়ে দেখা হয়েছে।
তবে ইতিবাচক এ অগ্রগতির পাশাপাশি একটি নেতিবাচক বাস্তবতাও উঠে এসেছে। চলতি শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্যবই পৌঁছাতে এনসিটিবি ব্যর্থ হয়েছে সময়মতো। শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় তিন মাস পর দেশের সব শিক্ষার্থীর হাতে সব বিষয়ের বই পৌঁছে। এই দেরির কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে। অথচ দোকানগুলোতে এই বই সহজলভ্য ছিল। নীলক্ষেত, বাংলাবাজার, সূত্রাপুর, আরামবাগসহ ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রথম থেকে দশম শ্রেণির সব বই পাওয়া গেছে।
জানা গেছে, অতিরিক্ত চাহিদার বই ঢাকায় ট্রাকযোগে এনে খোলা বাজারে বিক্রি করা হয়। প্রাথমিকের বইয়ের প্যাকেজ বিক্রি হয় ১,৫০০ টাকা এবং মাধ্যমিকের বইয়ের প্যাকেজ বিক্রি হয় ৪,৫০০ টাকায়। সন্তান যেন পিছিয়ে না পড়ে, এ চিন্তা থেকে অনেক অভিভাবক এসব বই বেশি দামে কিনতে বাধ্য হন। সরকার ২০১০ সাল থেকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করে আসছে। তবে বাস্তবে দেখা যায়, এসব বইয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় বাজারে। গত ২২ জানুয়ারি পুরান ঢাকার বাংলাবাজারে অভিযানে প্রায় ১০ হাজার বই উদ্ধার করা হয়, যা বিনামূল্যে বিতরণের জন্য ছাপানো হয়েছিল। আটক করা হয় দুইজনকে। একইদিনে শেরপুরে একটি ট্রাক ভর্তি সরকারি বই জব্দ করা হয়, যেখানে অষ্টম, নবম ও দশম শ্রেণির ৯ হাজার বই ছিল।
এবারের বাজে অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে এনসিটিবি আগাম প্রস্তুতি শুরু করেছে আগামী শিক্ষাবর্ষের বই সরবরাহের জন্য। গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দরপত্র আহ্বানের কাজ শুরু হয় এবং ইতিমধ্যে একাধিক শ্রেণির জন্য দরপত্র আহ্বান সম্পন্ন হয়েছে। এনসিটিবির লক্ষ্যমাত্রা, নভেম্বরের মধ্যেই সব বই ছাপিয়ে মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
এই উদ্যোগ সফল হলে শুধু অপচয় রোধই নয়, শিক্ষার্থীদের সময়মতো বই পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

