শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে ভিন্নমতাবলম্বীদের গুমের ঘটনা কেমন করে সংঘটিত হতো, তা নিয়ে তদন্ত কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়েছে ভয়াবহ তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গুম-প্রক্রিয়া পরিচালিত হতো একটি ‘তিন স্তরের পিরামিড কাঠামো’র মাধ্যমে, যার শীর্ষে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে, সঙ্গে ছিলেন তার প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
পিরামিডের দ্বিতীয় স্তরে অবস্থান করতেন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। আর নিচের স্তরে থাকা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও সদস্যরা এসব নির্দেশ বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতেন। কমিশনের পক্ষ থেকে ৪ জুন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: আ স্ট্রাকচারাল ডায়াগনসিস অব এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনটি জমা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, ২০০৯ সালের ৬ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে সংঘটিত গুমের ঘটনাগুলোর ওপর ভিত্তি করে এই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
কমিশনের কাছে এখন পর্যন্ত গুমের অভিযোগ এসেছে মোট ১ হাজার ৮৫০টি। এর মধ্যে ১ হাজার ৩৫০টি অভিযোগ যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৩৪৫ জন ব্যক্তি। প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সময়কালে আইন প্রয়োগকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভেতরে এমন এক পরিবেশ গড়ে উঠেছিল যেখানে গুমের মতো গুরুতর অপরাধ নিয়েও ছিল নীরব সম্মতি। এটি প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংগঠনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছিল, যেখানে গুমকে আর অপরাধ হিসেবে দেখা হতো না। বরং জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে এটিকে একটি দায়িত্বপূর্ণ এবং বৈধ কাজ হিসেবে ধরা হতো। এই মানসিকতা থেকেই অনেকেই এমন নির্দেশ পালন করতেন, যদিও এসব নির্দেশ অন্যায় ছিল।
কমিশনের প্রতিবেদনে একাধিক বাস্তব ঘটনার মাধ্যমে এই কাঠামোগত গুম-প্রক্রিয়ার প্রমাণ তুলে ধরা হয়েছে। একটি ঘটনায় দেখা যায়, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যায় জড়িত একজন কর্মকর্তার নথিতে তখনকার র্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ (পরবর্তীতে আইজিপি এবং বর্তমানে পলাতক) তাকে ‘খুবই সন্তোষজনক কর্মদক্ষতাসম্পন্ন’, ‘উচ্চমানের নেতৃত্বগুণসম্পন্ন’, ভদ্র এবং সৎ স্বভাবের’ ব্যক্তি হিসেবে মূল্যায়ন করেছিলেন। অথচ ওই কর্মকর্তার গুমে জড়িত থাকার বিষয়টি জানা ছিল। অন্যদিকে, আরেকজন কর্মকর্তার বিষয়ে দুর্নীতি ও অসদাচরণের নানা অভিযোগ থাকলেও গুমে তার সম্পৃক্ততার কোনো উল্লেখ নেই। বরং বলা হয়েছে, তিনি নিয়মিত র্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসানকে মাছ উপহার হিসেবে পাঠাতেন, যাকে ফিশ থেরাপি বলা হতো। জিয়াউল আহসান পরবর্তীতে এনটিএমসির মহাপরিচালক হন এবং বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
শেখ হাসিনার পতনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। ওই বছরের ১৪ ডিসেম্বর কমিশন তাদের প্রথম অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন ‘আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ’ প্রকাশ করে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। কমিশনের প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে এক বন্দিশালার প্রহরীর বক্তব্য, যিনি সেখানে দায়িত্ব পেয়ে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন। তাকে বলা হয়েছিল, বন্দীদের সঙ্গে স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ করা যাবে না, তাদের সব অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখতে হবে যেন তারা কষ্ট অনুভব করে। প্রহরী দায়িত্ব পালনে অপারগতা জানালে তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ৬ জানুয়ারি গুমে জড়িত ১১ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে। এদের মধ্যে ছয়জন ছিলেন ডিজিএফআইয়ের শীর্ষ কর্মকর্তা। তারা হলেন: লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদীন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদ-উল-ইসলাম।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তারা যখন ডিজিএফআইয়ের উচ্চ পদে কর্মরত ছিলেন, তখন সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবদুল্লাহিল আমান আযমী, হাসিনুর রহমান এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান গোপন বন্দিশালায় আটক ছিলেন। কমিশনের সঙ্গে সাক্ষাতে সিটিআইবির সাবেক পরিচালক পদমর্যাদার একজন সেনা কর্মকর্তা স্বীকার করেন, তিনি আমান আযমীর গুমের বিষয়ে তখনকার ডিজিএফআই মহাপরিচালকদের অবহিত করেছিলেন।
একইভাবে, আরেক ডিজিএফআই কর্মকর্তাও কমিশনকে জানিয়েছেন, আমান আযমী ও মাইকেল চাকমাকে বন্দিশালায় আটকে রাখার বিষয়ে তিনি ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব কর্মকর্তা অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) থাকাকালীনও সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুসারে বিদেশ ভ্রমণের জন্য অনুমতি নিতে হতো। তবে বর্তমানে তাদের অবস্থান জানা যাচ্ছে না।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা চাইলেই এই গুমের সংস্কৃতি বন্ধ করতে পারতেন। কারণ অন্যায় আদেশ মানা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ছিল না। কিন্তু তারা দায়িত্বহীনতা ও নৈতিক দিকনির্দেশনার অভাবে নিজেদের অবস্থানে ব্যর্থ হয়েছেন।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান এই প্রসঙ্গে বলেন, বাহিনীর সদস্যরা ন্যায়সংগত আদেশ মানতে বাধ্য হলেও অন্যায় আদেশ তারা অমান্য করতে পারেন। কিন্তু যারা গুম ও খুনের মতো আদেশ বাস্তবায়ন করেছেন, তারা দায়িত্বশীল আচরণ করেননি। ফ্যাসিবাদী শাসনের এই সময়কালে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, সেটাই এ ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের পথ করে দেয়

