২০২৫ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের জন্য ছাপানো পাঠ্যবইয়ে ব্যাপক অনিয়ম, নিম্নমান এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের রেশ না কাটতেই আগামী শিক্ষাবর্ষেও একই ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত মিলছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) ইতোমধ্যে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার জন্য দরপত্র প্রকাশ করেছে এবং তাতে এনে দিয়েছে বিতর্কিত সংশোধনী। এতে আশঙ্কা করা হচ্ছে, আগামী বছরও শিক্ষার্থীরা পাবে নিম্নমানের পাঠ্যবই। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপায় ব্যবহার করা হয় নিম্নমানের কাগজ, যার ফলে পাঁচ মাস পার না হতেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বই নড়বড়ে হয়ে গেছে। এ অবস্থায় বছরের বাকি সময়জুড়ে এসব বই দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে শিক্ষার্থীদের জন্য। তদন্তে উঠে এসেছে, কিছু প্রেস মালিকের অসাধু চক্র বাজেটের টাকার অপব্যবহার করে শত কোটি টাকা লোপাট করেছে।
এনসিটিবি সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার জন্য এবার বাজেট নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। প্রাক-প্রাথমিক শ্রেণির বইয়ের দরপত্রে ২২.৭৫ ও ৩৩.৫ ইঞ্চি ওয়েব মেশিন থাকার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। পরে সংশোধনী এনে সেটি পরিবর্তন করে ২২ ও ৩২ ইঞ্চি মাপ উল্লেখ করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই মাপের মেশিনে যথাযথভাবে বই ছাপানো সম্ভব নয়, ফলে পুনরায় নিম্নমানের বই পাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
গবেষণায় উঠে এসেছে, কিছু প্রেস মালিকদের একটি অসাধু চক্র কয়েক কোটি টাকার তহবিল গঠন করে এনসিটিবিকে চাপ দিয়ে মেশিনের মাপে সংশোধনী আনিয়েছে। যেহেতু বইগুলো প্রাথমিক পর্যায়ের, এনসিটিবি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং এই চক্রের অর্থ প্রভাবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সংশোধনীর পক্ষে মত দেন। এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবু নাসের টুকু জানান, শুরুতে উপযোগী মেশিনের মাপ দিয়েই দরপত্র আহ্বান করা হয়, যাতে তিনটি প্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। তবে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের নির্দেশে সংশোধনী আনা হয়, যাতে আরও প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করতে পারে।
একইসঙ্গে অভিযোগ রয়েছে, এনসিটিবি থেকে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে সক্ষমতার অতিরিক্ত বইয়ের কাজ দেওয়া হয় আনন্দ প্রিন্টার্সের মালিক রব্বানি জব্বারকে। তার প্রেস থেকে ছাপা ২০ হাজার বইয়ের মান খারাপ হওয়ায় সেগুলো কেটে ফেলে এনসিটিবি। রব্বানি জব্বার পতিত সরকারের এক সাবেক পূর্ণ মন্ত্রীর ভাই এবং নিজেও নেত্রকোনার এক উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান। তিনি এখনো বাংলাদেশ মুদ্রণ সমিতির সভাপতির পদ আঁকড়ে আছেন এবং তাঁর পক্ষে সমর্থন দিচ্ছেন সমিতির শীর্ষ পর্যায়ের কয়েকজন নেতা। যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন বা বার্তার জবাব দেননি।
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে ছাপা বইয়ের মান যাচাইয়ে এনসিটিবি ৩২টি দল দেশের ৬৪ জেলায় পাঠায়। দৈবচয়ন পদ্ধতিতে সংগ্রহ করা বই পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রায় ৩৩ শতাংশ বইয়ের মান অত্যন্ত নিম্নমানের। ৪০ কোটির মধ্যে প্রায় ১৩ কোটি বইতে জিএসএম, ঔজ্জ্বল্য এবং বাঁধাইয়ের ঘাটতি পাওয়া গেছে। হাই-টেক সার্ভে অ্যান্ড ইন্সপেকশন সার্ভিসকে দিয়ে করা পরীক্ষায় উঠে আসে, লেটার এন কালার লিমিটেড ৮০ জিএসএমের পরিবর্তে ৬৯ ও ৭০ জিএসএমের কাগজ ব্যবহার করেছে। অনুপম প্রিন্টার্স ৭০-এর জায়গায় ৬১ জিএসএম, অক্সফোর্ড প্রেস ৮০-এর পরিবর্তে ৭৩ জিএসএম এবং দ্য গুডলাক ৮০-এর জায়গায় ৭১ জিএসএম ব্যবহার করেছে।
এই প্রসঙ্গে লেটার এন কালার লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী শেখ সিরাজউদ্দিন বলেন, আমরা ৭০ ও ৮০ উভয় জিএসএমের কাজ করেছি। কোনো বইয়ে ভুল হয়ে থাকতে পারে। এনসিটিবি আমাদের চিঠি দিয়েছে এবং আমরা বইগুলো রিপ্লেস করছি।” হাই-টেকের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, শাফিন প্রেস ৭০-এর পরিবর্তে ৫৯, সুবর্ণা প্রিন্টার্স ৫৫, অ্যারিস্টোক্র্যাটস সিকিউরিটি প্রিন্টিং ৫৬, বর্ণমালা প্রেস ৫৮, ন্যাশনাল প্রেস ৬৩, বর্ণমালা ৬০, দোয়েল প্রিন্টার্স ৬৫.৫ এবং রেদওয়ানিয়া প্রেস ৬৫ জিএসএমের কাগজ ব্যবহার করেছে।
এনসিটিবির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, ১৬টি প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে নিম্নমানের বই রিপ্লেস করতে বলা হয়েছে। তারা না করলে তাদের ২০ শতাংশ জমাকৃত অর্থ কেটে নেওয়া হবে। এ বিষয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বই ছাপার দরপত্রে আনা সংশোধনী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মূলত মেশিনের সঠিক মাপ দিয়েই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। কিন্তু ১১৬টি প্রতিষ্ঠান সংশোধনীর অনুরোধ করে চিঠি দেয়। তাদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের অনুমতিক্রমে সংশোধনী আনা হয়েছে। তবে তাদের স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী মানসম্পন্ন বই সরবরাহ করতে হবে, এমন নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
এইসব অনিয়ম ও অসাধুতার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে প্রতি বছরই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছাবে দুর্বল মানের পাঠ্যবই, যা তাদের শিক্ষা গ্রহণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। অতএব, শিক্ষা খাতের এই গুরুতর অনিয়মের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

