চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে রোগীদের দেওয়া ইউজার ফি বাবদ বিভিন্ন খাতে আদায়কৃত প্রায় ৫৯ লাখ টাকা আত্মসাতের ঘটনায় দায়ের অভিযোগে হাসপাতালের ক্যাশিয়ার মো. আজিজুল হক সেলিমের বিরুদ্ধে তিনটি তদন্তে সত্যতা মিলেছে। এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য বিভাগ গঠিত পৃথক তিনটি তদন্ত কমিটি। এসব তদন্ত প্রতিবেদনে সেলিম অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকারও করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মসাতের পর তিনি মাত্র দুই লাখ টাকার মতো ফেরত দিয়েছেন। এখনো তার কাছে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ৫৭ লাখ ৬০ হাজার ১৫৫ টাকা বকেয়া রয়েছে। এর পরও এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের প্রশাসনিক কিংবা আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তিনি বহাল তবিয়তে নিজের কর্মস্থলেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
হাসপাতালের গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২-২৩, ২০২৩-২৪ এবং চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে হাসপাতালের প্যাথলজি, ইসিজি, আইসিইউ, টিকিট কাউন্টার, জরুরি বিভাগ, রেডিওলজি, ফিজিওথেরাপি, পেয়িং কেবিন ও বেড, অ্যাম্বুল্যান্স এবং ওয়ার্ড-১০ এর মতো বিভাগগুলো থেকে রোগীদের দেওয়া মোট ৫৮ লাখ ৬৯ হাজার ৩৯০ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেননি ক্যাশিয়ার সেলিম।
এই দুই প্রতিবেদন পাওয়ার পর হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুল মান্নান গত ১২ মার্চ বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. অং সুই প্রু মারমা বরাবর একটি লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন। পরবর্তীতে বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয় থেকে উপপরিচালক ডা. কামরুল আজাদকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত চলাকালীন সময়ে ক্যাশিয়ার সেলিম প্রায় দুই লাখ টাকা ফেরত দেন, তবে তদন্ত কমিটি বাকি অর্থ আত্মসাতের বিষয়টিও নিশ্চিত করে।
এই তদন্তে দেখা যায়, তিন অর্থবছরে চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের ইউজার ফি বাবদ ক্যাশিয়ারের আদায়কৃত অর্থের মধ্যে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১২ লাখ ১০ হাজার ৭৭৫ টাকা, ২০২৩-২৪ সালে ৩৭ লাখ ৭৫ হাজার ৯৫৫ টাকা এবং চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জানুয়ারি পর্যন্ত সাত লাখ ৭৩ হাজার ৪২৫ টাকা জমা হয়নি। সব মিলিয়ে মোট পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৭ লাখ ৬০ হাজার ১৫৫ টাকা, যা সরকারি কোষাগারে জমা না দেওয়ার তথ্যও প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে।
এ বিষয়ে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাসপাতালের সদ্য বিদায়ী তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুল মান্নান বলেন, গত জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব নেওয়ার পর ইউজার ফি মনিটরিং করতে গিয়ে দেখা যায়, ক্যাশিয়ার নিয়মিতভাবে আদায়কৃত অর্থ জমা দিচ্ছেন না। তার গড়িমসির কারণেই প্রথম তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন হাসপাতালের আরএমও। ওই কমিটি চলতি অর্থবছরে ৯ লাখ টাকা তছরুপের তথ্য তুলে ধরে। এরপর আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয় জ্যেষ্ঠ এক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে প্রধান করে, যেখানে ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকার অনিয়মের প্রমাণ মেলে।
ডা. মান্নান বলেন, দুই তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিভাগীয় পরিচালক বরাবর বিস্তারিত প্রতিবেদন পাঠিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানাই। চট্টগ্রামের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. অং সুই প্রু মারমাও বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, তার কার্যালয় থেকে করা তদন্তেও অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। সেই অনুযায়ী মাসখানেক আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। দপ্তরের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন বলেও তিনি জানান।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক ও কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. আকরাম হোসেন বলেন, আমরা তদন্ত শেষে বিষয়টি বিভাগীয় পরিচালকের কার্যালয়ে পাঠিয়েছি। এখন পরবর্তী পদক্ষেপ স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকেই জানা যাবে। অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ক্যাশিয়ার মো. আজিজুল হক সেলিম বলেন, কিছু টাকা জমা দিয়েছি। তবে কত টাকা জমা দিয়েছেন এমন প্রশ্নে কোনো উত্তর দেননি। এ ছাড়া বর্তমানে তিন-চার মাস ধরে টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে না থাকার দাবি করেন তিনি।
তিনটি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলেও এখনো পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক কার্যালয় থেকে কোনো শাস্তিমূলক পদক্ষেপ না নেওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশাসনিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে এ ধরনের অনিয়ম আরও উৎসাহিত হতে পারে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা

