ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দেশের প্রধান আকাশপথ প্রবেশদ্বার হলেও বর্তমানে এটি চোরাচালানকারীদের জন্য এক প্রকার ‘নিরাপদ রুটে’ পরিণত হয়েছে। বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে সীমিত জনবল ও পুরনো প্রযুক্তির স্ক্যানিং ব্যবস্থা এই সমস্যা আরও প্রকট করে তুলেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিনিয়ত আসছে অবৈধ পণ্য ও বিপুল পরিমাণ সোনা।
কার্গো টার্মিনালটি এখনো পুরনো অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। অত্যাধুনিক এক্স-রে মেশিন বা তিন স্তরের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা না থাকায় চালান যাচাই হয় কাগজে-কলমে, যা চোরাচালান রোধে কার্যকর নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ চালান আসে ও যায়। তবে সে অনুযায়ী নেই স্ক্যানিং যন্ত্র, নেই পর্যাপ্ত সংখ্যক দক্ষ জনবল। একদিকে জনবল সংকট, অন্যদিকে মেশিনের প্রযুক্তিগত দুর্বলতা, এই দুইয়ের ফলে চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ কার্যত অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্ক্যানিং ব্যবস্থা পুরনো থাকায় অনেক সময় অস্ত্র, স্বর্ণ বা মাদকদ্রব্য ধরা পড়ে না। অনেক সময় আবার স্ক্যানার কাজই করে না। তখন খালি চোখে দেখে চালান অনুমোদন দিতে হয়। এর সুযোগ নিচ্ছে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো। তাঁরা যথেষ্ট প্রভাবশালী হওয়ায় নিরাপত্তা কর্মীরা চাইলেও অনেক কিছু করতে পারেন না।
বিমানবন্দর ব্যবহার করে সম্প্রতি একাধিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। সম্প্রতি কাস্টমস ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর যৌথ অভিযানে প্রায় ২০ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। উদ্ধার হওয়া চালানগুলোতে দেখা যায়, এগুলো মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা। সেখানকার কর্মরত বাংলাদেশিদের মাধ্যমে এসব স্বর্ণ পাঠানো হয়, আর দেশে একটি বড় সিন্ডিকেট তা গ্রহণ করে বাজারে ছাড়ে।
এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে একজন অভিজ্ঞ কাস্টমস কর্মকর্তা জানান, আমাদের স্ক্যানারগুলো প্রায় এক দশক পুরনো। দিনে ১৮-২০ ঘণ্টা চলার ফলে এগুলো প্রায়ই বিকল হয়ে যায়। নতুন প্রযুক্তির স্ক্যানার ও স্বয়ংক্রিয় মনিটরিং সিস্টেম ছাড়া এই সমস্যা থেকে মুক্তি মিলবে না। জনবল নিয়েও রয়েছে বড় ধরনের সমস্যা। শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগ, বিএসএফআইসি, এয়ারপোর্ট কাস্টমস প্রতিটি সংস্থারই লোকবল সীমিত। রাতের বেলায় তো এই সংকট আরও তীব্র হয়। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সময় বেছে চোরাচালান চালায়।
বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, নতুন কার্গো ভিলেজ নির্মাণের কাজ চলমান। সেটি চালু হলে স্ক্যানিং ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন আসবে। তবে প্রকল্পটি ধীরগতির হওয়ায় তা বাস্তবায়নে আরও সময় লাগবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে চোরাচালান রোধে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আধুনিক স্ক্যানিং যন্ত্র ও প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগ সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। চোরাচালান একটি জাতীয় অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত হুমকি। এর প্রভাব কেবল রাজস্ব ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং দেশে সন্ত্রাস, অস্ত্র ও মাদকের বিস্তারেও এর ভূমিকা রয়েছে। তাই শুধুমাত্র প্রযুক্তি নয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় ও জবাবদিহিতা বাড়ানো এখন অত্যাবশ্যক।
বিমানবন্দরকে নিরাপদ করতে হলে দ্রুত স্ক্যানিং ব্যবস্থা আধুনিকীকরণ, প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ এবং দায়িত্বশীল সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলার ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। তা না হলে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিমানবন্দরটি চোরাচালানকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হতে বেশি সময় লাগবে না।

