দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিবির জন্য বরাদ্দকৃত শুকনো রেশন নিয়ে এক ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জান্নাত ট্রেডার্স ও জে কে এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে সরকারি রেশন আত্মসাতের বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রতিষ্ঠান দুটি বিজিবির চাহিদাপত্র জাল করে এবং অধিনায়কের স্বাক্ষর স্ক্যান করে নকল কাগজপত্র তৈরি করে কোটি কোটি টাকার খাদ্যশস্য কালোবাজারে বিক্রি করেছে। এই অনিয়ম দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে এবং কিছু ভেতরের ও বাইরের অসাধু ব্যক্তির সহায়তায় সংঘটিত হয়েছে।
বিজিবির রেশন সরবরাহের একটি নির্দিষ্ট ও কড়াকড়ি নিরাপত্তাবেষ্টিত পদ্ধতি রয়েছে। সাধারণত বিজিবির পক্ষ থেকে একটি মুখবন্ধ খামে চাহিদাপত্র পাঠানো হয় খাদ্য নিয়ন্ত্রণ অফিসে। খামটি সবার সামনে খোলা হয়, যেখানে বিজিবির সদস্য, খাদ্য অফিসার এবং ঠিকাদার উপস্থিত থাকেন। এরপর বরাদ্দের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে খাদ্য সরবরাহ করা হয় এবং তা গুদাম থেকে উত্তোলনের সময় বিজিবির সদস্যরাও উপস্থিত থাকেন। এই পুরো প্রক্রিয়ায় কোনোভাবেই অতিরিক্ত খাদ্য উত্তোলনের সুযোগ থাকার কথা নয়। তবুও, গত দুই বছরে এই দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই নিয়মনীতির ফাঁকফোকর খুঁজে বের করে বিপুল পরিমাণ খাদ্য গোপনে বেশি তুলে নেয় এবং তা বাজারে বিক্রি করে দেয়।
২০২৩ সালের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত জান্নাত ট্রেডার্সের মাধ্যমে সরবরাহ করা খাদ্যে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ে। বিজিবির চাহিদা ছিল ২৬৯ মেট্রিক টন চাল ও ৩০.১ মেট্রিক টন গম, কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি উত্তোলন করেছে ৩৭৩ মেট্রিক টন চাল ও ৪১.৪ মেট্রিক টন গম। এতে ১০৪ মেট্রিক টন চাল ও ১১.৩ মেট্রিক টন গম অতিরিক্ত নেয়া হয়। সরকারিভাবে ২.৫৫ টাকা দরে উত্তোলিত চাল ও ২.১৫ টাকা দরে উত্তোলিত গম যথাক্রমে ৪৮ টাকা ও ৪২ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে বাজারে।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালে তিন দফায় টেন্ডার পেয়ে জে কে এন্টারপ্রাইজ একই কায়দায় বিজিবির জন্য বরাদ্দকৃত রেশন থেকে ২৫৭.৪ মেট্রিক টন চাল এবং ২৮.৫ মেট্রিক টন গম অতিরিক্ত তুলে নেয়। প্রতিষ্ঠানটি ৬৬৪ মেট্রিক টন চাল ও ৭৩.১ মেট্রিক টন গমের জায়গায় উত্তোলন করে ৯২১.৪ মেট্রিক টন চাল ও ১০১.৬ মেট্রিক টন গম।
এই অতিরিক্ত খাদ্যশস্যও কালোবাজারে বিপুল দামে বিক্রি করে শত কোটি টাকারও বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রমাণ মিলেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, চাল এবং গম কালোবাজারে যথাক্রমে ৪৮ ও ৪২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়েছে, যা সরকারি দামের চেয়ে প্রায় বিশগুণ বেশি।
জে কে এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. জাফর জানান, শুধু ঠাকুরগাঁও নয়, সিলেট বিভাগসহ আরও কিছু এলাকায় এই ধরনের কাজ হয়েছে। তিনি স্বীকার করেন, এই অপকর্মে একা তিনি দায়ী নন, বরং বিজিবি ও খাদ্য অফিসের কিছু কর্মকর্তাসহ অনেকেই এর সঙ্গে জড়িত। জাফরের ভাষায়, “এই খাদ্য আমি একা উঠাতে পারিনি। মূলত এখানকার অনেকে জড়িত এবং তারাই আমাকে সহযোগিতা করেছে এবং এখান থেকে তারাও একটি অংশ নিয়েছে।” জাফরের বক্তব্যে উঠে আসে নিশ্চিন্তপুরের ব্যবসায়ী মো. মামুনের নাম। তিনি স্বীকার করেন, মামুন এ কাজে জড়িত এবং তার কাছ থেকে তিনি দেড় লাখ টাকা নিয়েছেন।
এই দুর্নীতির খবর জানাজানি হওয়ার পর বিজিবি স্পেশাল টিম এবং ঠাকুরগাঁও জেলা প্রশাসন থেকে একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসক ইশরাত ফারজানা বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, কোনো ব্যত্যয় পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মাহমুদুল হাছান বলেন, “আমরা নিয়ম অনুযায়ী সঠিকভাবে খাদ্য সরবরাহ করেছি। আমাদের কাগজে কোনো সমস্যা নেই।”
এই চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির ঘটনায় ঠাকুরগাঁওয়ের সচেতন নাগরিকরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সরকারি রেশন যেভাবে কালোবাজারে বিক্রি করে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে, তা শুধু আইন ভঙ্গই নয়, জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নেও বড় ধরনের উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। তারা অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং জড়িত সকল ব্যক্তির দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সামগ্রিকভাবে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদারকি ব্যবস্থায় আরও জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা আনার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি জোরালোভাবে সামনে এসেছে।

