ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার মহেশপুর পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের কারিগরি শাখার সহকারী শিক্ষক ছিলেন মো. কামরুজ্জামান সাচ্চু। প্রায় দুই বছর আগে তিনি রূপালী ব্যাংকের হাট খালিশপুর শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা কনজ্যুমার ঋণ গ্রহণ করেন। তবে ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে যান। পরবর্তীতে ডাকযোগে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে বিদ্যালয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এরপর থেকে তিনি ঋণের কিস্তিও আর পরিশোধ করছেন না।
সাচ্চুর এই ঋণের পরিশোধ বন্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন তাঁর সহকর্মী দুই শিক্ষক আরিফুল ইসলাম ও শারমিন আক্তার। ঋণের জামিনদার হিসেবে তাঁদের নাম থাকা দেখিয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ গত দুই মাস ধরে তাঁদের বেতন বন্ধ রেখেছে। এমনকি এবারের ঈদের বোনাসও তাঁরা পাননি। অথচ ভুক্তভোগী দুই শিক্ষকই দাবি করছেন, তাঁরা কখনো কোনো ঋণপত্রে স্বাক্ষর করেননি কিংবা জামিনদার হতে সম্মতিও দেননি।
বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কামরুজ্জামান ছিলেন ঝিনাইদহ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য শফিকুল আজম খানের (চঞ্চল) শ্যালক। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি বিদ্যালয়ে অনিয়মিত উপস্থিতি এবং দীর্ঘদিন ক্লাস না করেও নিয়মিত বেতনভাতা গ্রহণ করেছেন। শিক্ষকেরা অভিযোগ করেছেন, তিনি ১৫ বছরের চাকরিজীবনে কার্যত ক্লাস না করেই শুধুমাত্র খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যেতেন।
২০২২ সালে রূপালী ব্যাংকের খালিশপুর শাখা থেকে ১৫ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার সময় কামরুজ্জামান তাঁরই বিদ্যালয়ের দুই সহকর্মীর নাম জামিনদার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং তাঁদের স্বাক্ষর ও পরিচয়পত্র জালিয়াতির মাধ্যমে দাখিল করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষক আরিফুল ইসলাম জানান, “আমি কোনো ঋণের জামিনদার হইনি। আমার কোনো স্বাক্ষর কোথাও দেইনি। এটা জালিয়াতি করে করা হয়েছে। কামরুজ্জামান গত আগস্টের পর থেকেই আর এলাকায় নেই। ব্যাংক এখন আমাদের বেতন বন্ধ করে দিয়েছে।”
শিক্ষিকা নাসরিন আক্তারও একই অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, “আমাদের ছবি, জাতীয় পরিচয়পত্র চুরি করে ব্যাংকে জমা দিয়ে জাল স্বাক্ষরে ঋণ নিয়েছেন কামরুজ্জামান। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সেই সময় আমাদের উপস্থিতি ছাড়াই এসব তথ্য গ্রহণ করে ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। এখন বেতন না পেয়ে পরিবার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
এই বিষয়ে রূপালী ব্যাংক হাট খালিশপুর শাখার ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ তুহিন আলী বলেন, “আমরা বহুবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও কামরুজ্জামানের খোঁজ পাইনি। নিয়ম অনুযায়ী জামিনদার না পাওয়া গেলে তাঁদের থেকেই ঋণ আদায় করতে হবে। তবে দুই শিক্ষক আমাদের জানিয়ে দিয়েছেন যে, তাঁরা স্বাক্ষর করেননি। তাই তাঁদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে বলা হয়েছে। যদি প্রমাণ হয় তাঁরা স্বাক্ষর করেননি, তাহলে জামিনদার হিসেবে তাঁদের দায় থাকছে না।”
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রঞ্জন কুমার জানান, “বিষয়টির একটা সমাধান হয়েছে শুনেছি। এর বেশি কিছু জানি না কিংবা মন্তব্য করতে চাই না।” এদিকে, কামরুজ্জামানের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ থাকায় তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
এ ঘটনা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে। ভুক্তভোগী দুই শিক্ষক এখন ন্যায্য অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তা ফিরে পাওয়ার আশায় প্রশাসনিক সহায়তা ও ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঠিক তদন্ত প্রত্যাশা করছেন। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত না হলে এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনায় আরও নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয়রা।

