গত এক বছরের সরকারি সেবা গ্রহণের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সেবা গ্রহণকারীদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩১.৬৭ শতাংশই দুর্নীতি বা ঘুষের শিকার হয়েছেন। পুরুষের মধ্যে এই হার ৩৮.৬২ শতাংশ, আর নারীদের মধ্যে ২২.৭১ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল তাদের ‘সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস)’ এর মাধ্যমে এই তথ্য প্রকাশ করে।
সিপিএস জরিপটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশের ৬৪ জেলায় ১,৯২০টি প্রাইমারি স্যাম্পলিং ইউনিট থেকে সংগৃহীত ৪৫,৮৮৮টি খানার ১৮ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী মোট ৮৪,৮০৭ জনের সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে। এই জরিপে নাগরিকদের নিরাপত্তা, সুশাসন, সরকারি সেবার মান, দুর্নীতি, ন্যায়বিচার ও বৈষম্য সংক্রান্ত এসডিজি ১৬-এর ছয়টি সূচকের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা হয়। জরিপের প্রশ্নপত্র আন্তর্জাতিক মান অনুসারে জাতিসংঘের নির্দেশনায় প্রস্তুত করা হয়েছে।
সরকারি সেবা প্রদানকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিআরটিএতে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতি ঘটেছে। এখানে সেবা নিতে গিয়ে ৬৩.২৯ শতাংশ মানুষ দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থায় ৬১.৯৪, পাসপোর্ট অফিসে ৫৭.৪৫ ও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে ৫৪.৯২ শতাংশ মানুষ সেবা গ্রহণকালে ঘুষ ও দুর্নীতির সম্মুখীন হয়েছেন। দুর্নীতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবেদনের মাধ্যমে সমাজ সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে আসছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। তাদের নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারি জরিপে দুর্নীতির হার নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এতে বাস্তবতা লুকিয়ে নেই। বাংলাদেশে দুর্নীতির প্রকট চিত্রের প্রতিফলন এটি। আমাদের জরিপের তুলনায় সরকারি জরিপে দুর্নীতির হার কম হলেও দুর্নীতিগ্রস্ত খাতগুলো একই। এ ধরনের জরিপ অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
জরিপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নাগরিকদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। এখানে দেখা গেছে, মাত্র ২৭.২৪ শতাংশ মানুষ মনে করেন তারা সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে স্বাধীনভাবে রাজনৈতিক মত প্রকাশ করতে পারেন। পুরুষদের মধ্যে এ হার ৩১.৮৬ শতাংশ, নারীদের মধ্যে মাত্র ২৩.০২ শতাংশ। শহর ও গ্রামের মধ্যে তফাৎ খুব বেশি নয়; শহরে ২৭.৮৭ শতাংশ এবং গ্রামে ২৬.৯৪ শতাংশ নাগরিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে অনুভব করেন। রাজনীতিতে অংশগ্রহণ বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও জনগণের মধ্যে অস্বস্তিকর চিত্র দেখা গেছে। মাত্র ২১.৯৯ শতাংশ মনে করেন, তারা দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। পুরুষের মধ্যে এ হার ২৬.৫৫ শতাংশ, নারীদের মধ্যে ১৭.৮১ শতাংশ।
গত দুই বছরে ১৬.১৬ শতাংশ নাগরিক কোনো না কোনো ধরনের বিবাদ বা বিরোধের সম্মুখীন হয়েছেন। এদের মধ্যে ৮.৬০ শতাংশ বিচার ব্যবস্থায় প্রবেশাধিকার পেয়েছেন। বিচার ব্যবস্থার মধ্যে ৪১.৩৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক (আদালত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা) এবং ৬৮.৯৬ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক (কমিউনিটি নেতা, আইনজীবী) প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা পেয়েছেন। নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়ে জরিপে দেখা গেছে, ৮৪.৮১ শতাংশ মানুষ সন্ধ্যার পর নিজের এলাকায় একা চলাফেরা করতে নিরাপদ বোধ করেন। তবে পুরুষরা (৮৯.৫৩ শতাংশ) নারীদের (৮০.৬৭ শতাংশ) তুলনায় বেশি নিরাপদ বোধ করেন। শহরাঞ্চলে নিরাপত্তা বোধের হার ৮৩.৭৫ শতাংশ, গ্রামে ৮৫.৩০ শতাংশ।
এছাড়া সন্ধ্যার পর নিজের বাড়িতে নিরাপত্তা বোধের হার ৯২.৫৪ শতাংশ, যা নারীদের ক্ষেত্রে ৯১.৮২ এবং পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯৩.৩৫ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা ক্ষেত্রে ৪৭.১২ শতাংশ নাগরিক গত এক বছরে অন্তত একবার সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করেছেন। সেবাগ্রহীতাদের ৮২.৭২ শতাংশ মনে করেন স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য, আর ৮৯.৩৪ শতাংশের মতে স্বাস্থ্যসেবার খরচ তাদের সামর্থ্যের মধ্যে। স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রের মান, সেবাগ্রহীতার সঙ্গে আচরণ ও ডাক্তার বা স্বাস্থ্যকর্মীদের সময় দেয়ার ক্ষেত্রে সন্তুষ্টির হার যথাক্রমে ৬৫.০৭, ৬৩.১৩ ও ৬৩.১৯ শতাংশ।
শিক্ষাক্ষেত্রে দেখা গেছে, ৪০.৯৩ শতাংশ নাগরিকের অন্তত একজন শিশু সরকারি প্রাথমিক বা মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছে। প্রাথমিক স্তরে ৯৬.৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থী সহজে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেন এবং ৯২.৬৬ শতাংশের মতে শিক্ষা ব্যয় তাদের সামর্থ্যের মধ্যে। মাধ্যমিক স্তরে যথাক্রমে ৮২.২০ ও ৮০.৮৬ শতাংশ। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মান যথাক্রমে ৬৭.৯৩ ও ৭১.৮৬ শতাংশ নাগরিক সন্তুষ্ট। পরিচয়পত্র ও নাগরিক নিবন্ধনসহ অন্যান্য সরকারি সেবায় সেবা গ্রহণকারীদের ৭৮.১২ শতাংশ সেবার প্রাপ্যতা এবং ৮৬.২৮ শতাংশ সেবাপ্রাপ্তির খরচ সামর্থ্যের মধ্যে বলে মন্তব্য করেছেন। কার্যকর সেবাদান প্রক্রিয়া, সমান আচরণ ও সময়মতো সেবাদানে সন্তুষ্টির হার যথাক্রমে ৬২.৬০, ৫৬.২৬ ও ৫১.২৮ শতাংশ।
জরিপে পাওয়া অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, গত এক বছরে ১৯.৩১ শতাংশ নাগরিক কোনো না কোনো ধরনের বৈষম্য বা হয়রানির শিকার হয়েছেন। নারীদের মধ্যে এ হার কিছু বেশি (১৯.৬২%) এবং পুরুষদের মধ্যে ১৮.৯৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে বৈষম্যের হার ২২.০১ শতাংশ, গ্রামে ১৮.০৭ শতাংশ। আর্থসামাজিক অবস্থা ও লিঙ্গভেদে বৈষম্য বা হয়রানির ঘটনা সবচেয়ে বেশি। পরিবারে ৪৮.৪৪ শতাংশ, গণপরিবহন ও উন্মুক্ত স্থানে ৩১.৩০ শতাংশ এবং কর্মস্থলে ২৫.৯৭ শতাংশ মানুষ বৈষম্যের সম্মুখীন হয়েছেন। তবে মাত্র ৫.৩৫ শতাংশ ভুক্তভোগী এসব ঘটনা রিপোর্ট করেছেন।
এভাবে দেশের নাগরিকরা সরকারি সেবা থেকে দুর্নীতি, নিরাপত্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অভাব, বৈষম্যসহ নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হচ্ছেন। এই জরিপ সরকারের সেবা নীতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যবস্থায় সুসংগঠিত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও দৃঢ় করে। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে এই তথ্যের ভিত্তিতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সেবা মানোন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।

