বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রায় ৬২ হাজার একর জমির মধ্যে কয়েক হাজার একর রয়েছে অবৈধ দখলে। এসব জমি উদ্ধারে মাঝে মাঝে অভিযান চালানোর ঘোষণা এলেও, বাস্তবে তা কার্যকর হয় না। ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রস্তুতির পর হঠাৎ অভিযান বন্ধ হয়ে যায়। কখনো আবার মাঠে গিয়ে নামমাত্র অভিযান চালিয়ে ফিরে আসেন রেল কর্মকর্তারা। অভিযোগ রয়েছে, দখলদারদের সঙ্গে রেলের ভূমি কর্মকর্তাদের একাংশের অশুভ যোগসাজশের। ফলে বছরের পর বছর রেলের জমি বেদখলই রয়ে যাচ্ছে।
রেলওয়ের একটি সূত্র জানায়, গত ১৫ মে নেত্রকোনায় অবৈধভাবে দখল হওয়া জমি উদ্ধারের সিদ্ধান্ত হলেও শেষ পর্যন্ত অভিযান হয়নি। তার আগের দিন, ১৪ মে, ময়মনসিংহে এক কর্মকর্তা নামমাত্র অভিযান চালিয়ে ফিরে আসেন। ১৯ মে গেন্ডারিয়ায় উচ্ছেদের লক্ষ্যে নোটিশ দেওয়া হলেও, পরে অভিযান আর হয়নি। ওই মাসে কেবল নরসিংদীতে একটি অভিযান হয়েছে।
রেলের একজন কর্মকর্তা জানান, ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনেক সময় দখলদারদের ‘অর্থনৈতিক সমঝোতা’ হয়। কেউ কেউ উচ্ছেদের নোটিশ পাওয়ার পর তাৎক্ষণিকভাবে লেনদেনের মাধ্যমে বিষয়টি মিটিয়ে নেন। আবার কেউ কেউ আদালতে রিট করে দীর্ঘ সময় ধরে জমি দখলে রাখেন। এমনকি দখলকৃত জমিতে মার্কেট, ভবন ও স্থায়ী স্থাপনাও গড়ে তোলা হয়েছে। এ বিষয়ে রেলওয়ের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা ও ডেপুটি কমিশনার (ল্যান্ডস অ্যান্ড বিল্ডিং) মো. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, “উচ্ছেদে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তারাই আমার বিরুদ্ধে গুজব ছড়ায়। অবৈধ দখলদারদের সঙ্গে আঁতাত বা রিট করার সুযোগ নেই।”
রেলওয়ের অবকাঠামো দপ্তরের এক সূত্র জানায়, জনবল সংকট ও সঠিক নথিপত্র না থাকায় জমির হিসাবও অনেক সময় মিলে না। একসময় মন্ত্রী বা সচিব জমির তথ্য চাইলে পুরনো ছক অনুযায়ী অনুমান করে পরিমাণ জানানো হতো। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেদখল জমি উদ্ধারে কঠোর নির্দেশনা দিয়েছে। এমনকি মন্ত্রণালয় থেকেও জমি ছাড়ার নির্দেশনা সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে।
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ফাহিমুল ইসলাম বলেন, “রেলের জমি দখল নিয়ে আর নয়। এই সম্পত্তি ব্যবহার করে রেলের আয় দ্বিগুণ করা সম্ভব। তাই দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তবে বাস্তবে সেই উদ্যোগ সফল হচ্ছে না। রেল সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, অবৈধ দখলদারদের বড় অংশই রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। ফলে সরকারের আমলেই বাধা আসে। এ ছাড়া বেদখল জমির প্রকৃত হিসাব না থাকাও একটি বড় সমস্যা।
নথি অনুযায়ী, রেলের জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮২০.৯৭ একর। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে ৩৭ হাজার ৪১৯.৩৫ একর এবং পূর্বাঞ্চলে ২৪ হাজার ৪০১.৬২ একর। রেলওয়ের নিজস্ব কাজে ব্যবহার হয় প্রায় ৫১ শতাংশ জমি। ইজারা দেওয়া হয়েছে ১৪ হাজার ৪৭৩ একর। অবশিষ্ট জমির সুনির্দিষ্ট হিসাব নেই। এই জমির অনেক অংশে গড়ে উঠেছে বাজার, দোকানপাট, ভবন, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, গ্যারেজ, গুদামসহ স্থায়ী অবকাঠামো।
রেলের সাবেক এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রকৃত জমির পরিমাণ ও দখলের তথ্য জানার মতো ব্যবস্থা নেই। জনবল বাড়িয়ে সঠিক তথ্য সংগ্রহ জরুরি। কারণ, বৈধ-অবৈধ জমিকে ঘিরে রেলের ভেতরে ও বাইরে শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে।” রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আল ফাত্তাহ মো. মাসউদুর রহমান বলেন, “অভিযান চালানো হলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। জনবল সংকট বড় সমস্যা। তবে অন্তর্বর্তী সরকার কঠোর নির্দেশ দিয়েছে। এবার আশানুরূপ ফল আশা করছি।”
রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন বলেন, “উচ্ছেদ কার্যক্রমে অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। কিন্তু জমি উদ্ধার ছাড়া রেলের উন্নয়নের বিকল্প নেই। জমি উদ্ধারের পর তা পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যবহার করে আয় বাড়াতে হবে।

