চাকরির আয় সীমিত। তাই অনেকেই খোঁজেন বাড়তি আয়ের পথ। পুরান ঢাকার এক ব্যাংক কর্মকর্তা এমনই এক সুযোগের খোঁজে অনলাইনে বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনি খুইয়েছেন ১ কোটি ১০ লাখ টাকা। প্রতারক চক্র টাকা নিয়ে গা-ঢাকা দিয়েছে। ভুক্তভোগী ওই কর্মকর্তা ২১ মে লালবাগ থানায় অজ্ঞাত কয়েকজনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগে মামলা করেছেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়তি আয় করতে গিয়ে তিনি ‘আপওয়ার্ক ফ্রন্টডেস্ক–২০২৩’ নামের একটি ভুয়া প্ল্যাটফর্মে জড়িয়ে পড়েন। শুরুতে কয়েক হাজার টাকা আয়ও করেন। পরে ওই প্রতিষ্ঠানের অংশীদার করার প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হন। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে ধার এবং ব্যাংক ঋণ নিয়ে ১ কোটি টাকার বেশি একটি ব্যাংক হিসাবে পাঠান। পরে বুঝতে পারেন, কাগজপত্র ভুয়া। প্রতারকদের ফোনও বন্ধ পাওয়া যায়।
১০ দিনে কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ: ৩৬ বছর বয়সী এই কর্মকর্তা পুরান ঢাকার বাসিন্দা। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক শেষ করে কয়েক বছর আগে একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি নেন। বর্তমানে পুরান ঢাকাতেই কর্মরত। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর হঠাৎ তাঁর হোয়াটসঅ্যাপে ‘নাজনীন’ নামের এক নারীর খুদে বার্তা আসে। তাতে বলা হয়, আপওয়ার্ক নামে একটি প্রতিষ্ঠানে খণ্ডকালীন অনলাইন কাজের সুযোগ রয়েছে। তিনি আগ্রহ দেখালে তাঁকে একটি ওয়েবসাইটে নিবন্ধন করতে বলা হয়। পরে তাঁকে ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে দেওয়া হয় ১৫০ টাকা। এরপর টেলিগ্রামে একটি চ্যানেলে যুক্ত করে দেওয়া হয়। সেখান থেকেই শুরু হয় তাঁর কাজ।
প্রথমে তাঁকে কয়েকটি অনলাইন কাজ দেওয়া হয়, যার বিনিময়ে প্রতিবার ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিকাশে পাঠানো হতো। কয়েক দিন এমন চলার পর তাঁকে ‘ভিআইপি গ্রুপে’ যুক্ত করা হয়। তখন তাঁর ব্যাংক হিসাবেও বড় অঙ্কের অর্থ জমা হতে থাকে। ভুক্তভোগী কর্মকর্তা জানান, তখন তাঁকে একটি ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট খুলতে বলা হয়। তিনি খুলে দেন। পরে বলা হয়, ওই অ্যাকাউন্টের টাকা তুলতে হলে আরও বিনিয়োগ করতে হবে। তিনি বিনিয়োগ করেন।
এরপর এক প্রতারক নিজেকে প্রতিষ্ঠানের পরিচালক পরিচয় দিয়ে তাঁকে অংশীদার হওয়ার প্রস্তাব দেন। কর্মকর্তা রাজি হন। ১২ থেকে ২২ ডিসেম্বর, মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে তিনি বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে মোট ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পাঠান।
প্রতারকদের একজন নিজেকে লন্ডনে অবস্থানরত পরিচালক পরিচয় দেন। তাঁকে অনলাইনে একটি অংশীদারিত্বের চুক্তিপত্র পাঠানো হয়। পরে তিনি জানতে পারেন, সেটি ভুয়া। যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে দেখা যায়, প্রতারকদের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর বন্ধ। ভুক্তভোগী বলেন, ‘‘আমি আগে কখনো অনলাইনে কাজ করিনি। হঠাৎ করে হোয়াটসঅ্যাপে এমন প্রস্তাব পেয়ে বিশ্বাস করে ফেলি। আমার মোবাইল অ্যাকাউন্টে টাকা আসতেও দেখি। তখন আর সন্দেহ করিনি।’’ তিনি জানান, প্রতারকেরা তাঁকে এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল যে, স্বাভাবিক বিবেচনাও হারিয়ে ফেলেছিলেন। বাবা–মা, আত্মীয়দের নানা অজুহাতে টাকা ধার করে এবং ক্রেডিট কার্ড থেকে ঋণ নিয়ে সব টাকা বিনিয়োগ করেন।
ঘটনার পর মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন তিনি। কয়েক দিন ঘরেই বন্দী ছিলেন। পরে পরিবারের সবার সহযোগিতায় নিজেকে সামলে নেন। থানায় মামলা করেন। লালবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তফা কামাল খান বলেন, “আপওয়ার্ক ফ্রন্টডেস্ক নামের প্রতিষ্ঠানটি পুরোপুরি ভুয়া। একটি সংঘবদ্ধ প্রতারকচক্র এই ফাঁদ পেতেছিল। ভুক্তভোগীর মামলাটি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত চলছে।” ব্যাংক কর্মকর্তা আশা প্রকাশ করেন, পুলিশ দ্রুত সময়ের মধ্যে প্রতারকদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনবে। তিনি বলেন, ‘‘যেসব ব্যাংক হিসাবে আমি টাকা পাঠিয়েছি, সেগুলোর তথ্য জোগাড় করতে পারলে প্রতারকদের খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।’’

