২০২৪ সাল ছিল বাংলাদেশের জন্য রাজনৈতিক ও আর্থিক অস্থিরতার বছর। দীর্ঘ ১৭ বছর ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অর্থ পাচারের নানা তথ্য একে একে প্রকাশ্যে আসতে শুরু করে। অন্তর্বর্তী সরকার এখন সেইসব অর্থ কেলেঙ্কারির তদন্ত চালাচ্ছে—যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠ মহল এবং দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা।
এই প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক (এসএনবি)’ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, তা নতুন করে চমকে দিয়েছে সবাইকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশি ব্যক্তি ও ব্যাংকের নামে সুইস ব্যাংকে জমা অর্থের পরিমাণ এক বছরে বেড়েছে সাড়ে ৮ হাজার কোটি টাকার বেশি।
এই হঠাৎ উল্লম্ফন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে—এই অর্থ বাণিজ্যিকভাবে গেছে, না কি সরকার পতনের আগে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হাত ধরে বিদেশে পাচার হয়েছে?
এক বছরে ১৬৫ গুণ বেড়েছে ব্যাংকের আমানত
এসএনবির তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শেষে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও ব্যাংকের সম্মিলিত আমানতের পরিমাণ ছিল ৫৮৯.৫৪ মিলিয়ন সুইস ফ্রাঁ। টাকায় যার পরিমাণ প্রায় ৮ হাজার ৮৩২ কোটি। আগের বছরের তুলনায় এটি ৩৩ গুণ বেশি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো—এই অর্থের ৯৮ শতাংশ জমা হয়েছে বাংলাদেশের কিছু ব্যাংকের নামে। অর্থাৎ এক বছরে ব্যাংকগুলোর আমানত বেড়েছে প্রায় ৮ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকা।
২০২৩ সালে বাংলাদেশি ব্যাংকগুলোর জমা ছিল মাত্র ৩.৪৮ মিলিয়ন ফ্রাঁ, যা ২০২৪ সালে দাঁড়িয়েছে ৫৭৬.৬১ মিলিয়নে—বৃদ্ধির হার প্রায় ১৬৫ গুণ।
অর্থ কোথা থেকে এল, গেল কোথায়?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সময়পর্যায়ে এমন অর্থ প্রবাহের কোনো স্বাভাবিক কারণ নেই। বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দুইটি বৈধ ব্যাখ্যা থাকতে পারে—সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাণিজ্য বেড়েছে অথবা বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য অর্থ পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমদানি-রপ্তানির পরিসংখ্যানে এমন প্রবণতা নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত বিনিয়োগ তথ্যেও এর কোনো ইঙ্গিত নেই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এমনকি কিছু দুর্বল ব্যাংকের (যেমন ফার্স্ট সিকিউরিটি, এক্সিম, পদ্মা ব্যাংক) আর্থিক অনিয়ম আগে থেকেই আলোচিত। ওইসব ব্যাংকের মালিকপক্ষের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ব্যাংক টু ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে সন্দেহ এড়িয়ে বিশাল অর্থ পাঠানো হয়ে থাকতে পারে।’
ব্যক্তি আমানত কমেছে, বাড়ছে গোপন অ্যাকাউন্ট
এসএনবির প্রতিবেদন বলছে, ব্যক্তি পর্যায়ে আমানত কিছুটা কমেছে—১৪.১৮ মিলিয়ন ফ্রাঁ থেকে কমে দাঁড়িয়েছে ১২.৬২ মিলিয়নে। তবে ফিডিউশিয়ারি লায়াবিলিটি হিসেবে আরও ৮.৬২ মিলিয়ন ফ্রাঁ জমা রয়েছে, যা ট্রাস্টি হিসাব বা মালিকানা গোপন করে রাখা অর্থ।
এ ছাড়া ‘অল আদার লায়াবিলিটিস’ বিভাগে আরও ৩ লাখ ৬ হাজার ফ্রাঁ রয়েছে। এর মধ্যে সুদ, ফি, ট্রাস্ট অ্যাকাউন্ট বা অফশোর ঋণের মতো জটিল দায় থাকতে পারে।
সব মিলিয়ে ২০২৪ সালের শেষে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের জমা অর্থ দাঁড়িয়েছে ৫৯৮.৫২ মিলিয়ন ফ্রাঁ, যা টাকায় প্রায় ৮ হাজার ৯৬৫ কোটি।
কারা এই টাকা জমা রেখেছে, জানার উপায় নেই
এই অর্থ কারা পাঠিয়েছে বা কোন ব্যাংকের নামে জমা, সেই তথ্য জানতে বাংলাদেশের পক্ষে এখনো সম্ভব হয়নি। এর আগে ২০২২ সালে বাংলাদেশ ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) ৬৭ জন সন্দেহভাজনের তথ্য জানতে সুইস কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করলেও, মাত্র একজনের তথ্য পাওয়া গিয়েছিল।
তথ্য পেতে হলে ‘এইওআই’ দরকার
বিশ্বব্যাপী কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার রোধে ২০১৮ সাল থেকে চালু হয়েছে অটোমেটিক এক্সচেঞ্জ অব ইনফরমেশন (AEOI) ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় ২০২৪ সালে সুইজারল্যান্ড ১০৮টি দেশের সঙ্গে ৩৭ লাখ ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য বিনিময় করেছে। প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তান এরই মধ্যে এই ব্যবস্থায় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো চুক্তিতে সই করেনি।
অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেনের মতে, এই চুক্তিতে অংশ নিতে সংসদের অনুমোদন লাগে না, একটি নির্বাহী আদেশেই সম্ভব। সিপিডির গবেষক তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, অর্থ বৈধ হোক বা অবৈধ—তা জানার একমাত্র উপায় হলো আন্তর্জাতিক তথ্য বিনিময়ে যুক্ত হওয়া। বহু আলোচনা হলেও বাংলাদেশ এখনো কার্যকরভাবে এই প্রক্রিয়ায় নেই।

