এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণে বাস্তবায়নযোগ্য ‘টিভিইটি টিচার্স ফর দ্য ফিউচার (টিটিএফ) প্রোগ্রাম’ প্রকল্প নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন। কারিগরি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আড়ালে ভবন নির্মাণ, বিদেশ ভ্রমণ ও পরামর্শক খাতে অস্বাভাবিক ব্যয়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প নথি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতি বর্গমিটারে ভবন নির্মাণে ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৮ হাজার ৯৮৫ টাকা, যা অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের তুলনায় দ্বিগুণ। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭ হাজার ৫৭৪ টাকা। অথচ সাধারণত এই খরচ ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মধ্যে থাকে।
শুধু নির্মাণ খরচই নয়, ৩৭৮ জন কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। এতে জনপ্রতি খরচ দাঁড়ায় ১৭ লাখ ৩০ হাজার টাকা। পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রকল্পটি ১ হাজার ২০০ কোটি টাকাতেই বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাঁদের দাবি, প্রকৃত প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে পুরো ঋণ ছাড়ের চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১০০ কোটি টাকা। পরিকল্পনাবিদদের মতে, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নিজস্ব জনবল দিয়েই এই কাজ করা যেত। এতে পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত খরচ অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এই প্রকল্পের ভবন নির্মাণ অংশ তৈরির দায়িত্বে থাকা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডেস্ক-৪) নির্বাহী প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম বলেন, এ ধরনের ভবন নির্মাণে প্রতি বর্গমিটারে ৫০ হাজার টাকার বেশি লাগে না। পরে নিজের তৈরি প্রকল্পেই অতিরিক্ত ব্যয় দেখে তিনিও বিস্মিত হন। পরিকল্পনা কমিশনের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো বিভাগের প্রধান অতিরিক্ত সচিব আব্দুর রউফ বলেন, ‘পিইসি সভায় প্রকল্পের অস্বাভাবিক ব্যয় কমানো হবে। ভবন নির্মাণে এত ব্যয় থাকবে না।’ তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, এই ব্যয় নিয়েই প্রকল্পটি অনুমোদনের পথে।
এই বিতর্কিত টিটিএফ প্রকল্পসহ মোট ৮ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকার ১৭টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য আজ মঙ্গলবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় তোলা হচ্ছে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
-
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্প: উপজেলা কমপ্লেক্স সম্প্রসারণ প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়, দ্বিতীয় সংশোধিত), বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী ও স্থানীয় জনসাধারণের সমন্বিত সেবা ও জীবিকা উন্নয়ন।
-
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: সাত বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যার মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণ।
-
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়: চারটি মেরিন একাডেমিতে সিমুলেটর স্থাপনসহ সক্ষমতা বৃদ্ধি।
-
ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ: আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ সম্প্রসারণে তৃতীয় সাবমেরিন কেবল স্থাপন (দ্বিতীয় সংশোধিত)।
-
শিল্প মন্ত্রণালয়: সার সংরক্ষণ ও বিতরণ সুবিধার জন্য ১৩টি নতুন বাফার গোডাউন নির্মাণ (তৃতীয় সংশোধিত, চতুর্থবার বৃদ্ধি)।
-
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়: কিশোর-কিশোরী ক্লাব স্থাপন (প্রথম সংশোধিত), নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে সমন্বিত সেবা জোরদারকরণ এবং কুইক রেসপন্স টিম গঠন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক সংকটের সময়েও প্রকল্পে এমন অস্বাভাবিক ব্যয় প্রশ্ন তোলে—আসলে কি উন্নয়ন হচ্ছে, না কি উন্নয়নের নামে চলছে লুটপাট? এমন ব্যয়বহুল প্রকল্প অনুমোদিত হলেও, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছাড়া কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব কি না, তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

