গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে জড়াতে অস্বীকৃতি জানানো কিছু কর্মকর্তার তথ্য উঠে এসেছে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে। কমিশনের দাবি, এসব কর্মকর্তারা তাঁদের আপত্তির কথা লিখিতভাবে জানিয়ে চিঠি দিয়েছিলেন, যা সরাসরি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে যেত।
গত ৪ জুন অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে জমা দেওয়া দ্বিতীয় অন্তর্বর্তী প্রতিবেদনে এমনই একটি ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। সেখানে বলা হয়, একজন র্যাব কর্মকর্তা এক বন্দীকে হত্যার নির্দেশ পান। সহকর্মীর অসতর্কতায় বন্দীর অবস্থান ফাঁস হয়ে যাওয়ায় তাকে ‘হত্যা’ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ওই কর্মকর্তা স্পষ্ট জানান, তিনি এমন আদেশ মানবেন না। বরং তিনি বলেন, “যদি ওনাকে মারতে হয়, তাহলে আমাকে সরিয়ে দিন, আমি মারব না।”
পরবর্তীতে ওই বন্দীকে হত্যা করা হয়নি এবং ৫ আগস্টের পরও ওই কর্মকর্তা চাকরিতে বহাল ছিলেন। কমিশনের ভাষ্য অনুযায়ী, বেআইনি আদেশ অমান্য করলেই সঙ্গে সঙ্গে খারাপ পরিণতি হতো, এমন নয়। কমিশন জানায়, ঘটনাটি অনুসন্ধানে ‘সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রতিবাদের নজির’। ৫ আগস্টের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের একজন কর্মকর্তা গণভবনে পরিত্যক্ত কিছু নথি পর্যালোচনার সময় র্যাব কর্মকর্তাদের হাতে লেখা দুটি চিঠি খুঁজে পান। সেখানে বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছিল। এগুলো আনুষ্ঠানিক পত্র নয়, ব্যক্তিগত ঘোষণাপত্র ছিল। তবু এগুলো সরাসরি শেখ হাসিনার কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত সেগুলো নিজের ফাইলে সংরক্ষণ করেন।
এক চিঠিতে লেখা ছিল, “যখন র্যাব কর্তৃপক্ষ আমাকে অভিযানে যাওয়ার নির্দেশ দেয়, তখন আমি বলেছিলাম যে, যদি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা গুলি চালানোর পরিকল্পনা থাকে, তাহলে আমি এই ধরনের কাজে অংশ নিতে পারি না।”
কমিশনের প্রতিবেদন বলছে ৫ আগস্টের পর সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া প্রকাশ্যে জানান, এই কর্মকর্তারা তখন দ্রুত মিলিটারি পুলিশের একটি চেকপোস্টে আশ্রয় নেন এবং পরে তাঁদের সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। অবাক করার বিষয়, আদেশ অমান্য করলেও তাঁদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। অথচ তাঁদের পদক্ষেপ সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত পৌঁছেছিল। প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে কমিশন বলেছে, এসব চিঠি শুধু দমননীতির একটি ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্তই নয়, বরং প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনা এসব বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে নজর রাখতেন। প্রায় এক দশক ধরে চিঠিগুলো ফাইলে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত তা-ই নির্দেশ করে। কমিশনের ভাষ্য মতে, এই ঘটনা শেখ হাসিনার সক্রিয় সম্পৃক্ততার ‘প্রমাণ নয়’, তবে একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার ভেতরেও কিছু বিবেকবান কর্মকর্তার অবস্থান গ্রহণের বিরল নিদর্শন।
কমিশনের মতে, গুমের আদেশ আসত রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে, যার বাস্তবায়ন করত নিরাপত্তা বাহিনী। ডিজিএফআই-এর সাবেক মহাপরিচালক লে. জেনারেল (অব.) আকবর হোসেন জানান, হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে (সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে) নিয়ে তিনি শেখ হাসিনার সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছিলেন। ডিজিএফআইয়ের একজন কনিষ্ঠ কর্মকর্তাও কমিশনকে বলেন, তিনি শুনেছেন, শেখ হাসিনা এক বন্দী সম্পর্কে অবগত এবং মতামতও দিয়েছিলেন। তাঁর সহজ ভঙ্গির মন্তব্য থেকেই বোঝা যায়, আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়েও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
কমিশনের ভাষায়, ওই সময় ডিজিএফআই-এর শীর্ষ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনা ও তাঁর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক সিদ্দিকের মধ্যকার যোগসূত্র হিসেবে কাজ করতেন। অর্থাৎ ঘটনাগুলো নিরাপত্তা বাহিনীর একক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকেই আদেশ আসত।
দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ গুমের ঘটনা অস্বীকার করে এসেছে। দাবি করেছে, নিখোঁজ ব্যক্তিরা হয়তো স্বেচ্ছায় গা-ঢাকা দিয়েছেন কিংবা অপরাধে জড়িত ছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এখন দলটি বলছে, এমন কিছু ঘটনা ঘটলেও তা হয়তো সেনাবাহিনীর ‘নিজস্ব উদ্যোগে’ হয়েছে। শেখ হাসিনা বা তাঁর মন্ত্রিসভার কেউ এসবের নির্দেশ দেননি। তবে কমিশনের মতে, এই বক্তব্য রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশল। এতে একদিকে নিরাপত্তা বাহিনীকে পুরো দায়ী করা হচ্ছে, অন্যদিকে বেসামরিক আদেশদাতাদের সম্পৃক্ততা আড়াল করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেকেই গুমে সরাসরি যুক্ত না থাকলেও পরে পালাতে থাকা ব্যক্তিদের সহায়তা করে নতুনভাবে অপরাধে জড়িয়েছেন। এদের ভূমিকা এখন তদন্তের আওতায়। কমিশন বলছে, যারা গুমের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছেন বা ভিন্নমত পোষণ করেছেন, তাঁদের পেশাগত জীবনকে নষ্ট করার চেষ্টা করা হয়েছে। বয়স চল্লিশের কোঠায় একজন কর্মকর্তা জানান, তিনি ভিন্ন মত পোষণ করায় সহকর্মীদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়। নতুন পদায়নের আগে সংশ্লিষ্ট অফিসে তাঁর বিরুদ্ধে সন্দেহ ছড়ানো হতো। এমনকি পরিবার পরিজনের উপরও নজরদারি চালানো হতো। কোনো শৃঙ্খলাভঙ্গ না করেও তাঁকে পেছনে ফেলতে নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিলের মতো কৌশল নেওয়া হয়।
কমিশন বলছে, গুমে সংশ্লিষ্ট সাত কর্মকর্তার বিষয়ে গোয়েন্দা সংস্থার নথিপত্রে সব কিছু ছিল—তাঁদের রাজনৈতিক যোগসূত্র, আত্মীয়স্বজনের পরিচয়, দুর্নীতির অভিযোগ—তবে ‘গুম’ শব্দটি কোথাও ছিল না। এটি নির্দেশ করে, এসব ঘটনা একক ব্যক্তি বা বিচ্ছিন্ন পদক্ষেপ নয়, বরং একটি বড় কাঠামোর মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়েছে।

