বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) শুধু দেশের নয়, বিশ্ব ক্রিকেটের অন্যতম ধনী সংস্থা। ২০১২ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৩ সালের জুলাই পর্যন্ত সংস্থাটি ব্যয় করেছে প্রায় ২৭৭২ কোটি টাকা। এই সময়টিতে বিসিবির নেতৃত্বে ছিলেন আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী নাজমুল হাসান পাপন। তাঁর শাসনামলে বিসিবিতে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেগুলো এখন দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তের আওতায় এসেছে।
![]()
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বল কেনায় খরচ হয়েছে ৯২ কোটি টাকা, বোর্ড সভায় ১৯ কোটি এবং সাধারণ সভায় ১১ কোটি টাকা। শুধু বিপিএলের হিসাবেই ১১৩ কোটি টাকার হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। দুদক অভিযোগ খতিয়ে দেখে ২৭টি খাতে বিসিবির নথি চেয়েছে। উপপরিচালক মো. সাইদুজ্জামানের নেতৃত্বে অনুসন্ধান চলছে। পাশাপাশি এনফোর্সমেন্ট শাখাও একাধিকবার বিসিবিতে অভিযান চালিয়েছে এবং সরাসরি অনিয়ম-জালিয়াতির তথ্য পেয়েছে।
কমিশনের আরেক উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম জানান, নাজমুল হাসান পাপন সংশ্লিষ্ট অভিযোগ তদন্তে বিসিবির কাছ থেকে প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং অনুসন্ধান শেষে একাধিক মামলার সুপারিশ আসতে পারে। নাজমুল হাসান পাপন ১২ বছরে ৫২ বার বিদেশ সফর করেছেন। প্রতিবারই বিজনেস ক্লাসে যাত্রা, দৈনিক ৪০০ ডলার করে ভাতা এবং বাড়তি সময়ের টিএ-ডিএ নিয়েছেন। ২০১৯ ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে শুধু টিকিট কেনার পেছনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫ কোটি টাকা। আইসিসির মাত্র দুই দিনের সভার জন্য ১২ দিনের টিএ-ডিএ তুলেছেন তিনি।
১৩ বছরে ছয়টি অডিট ফার্মের মাধ্যমে বিসিবির অডিট হয়েছে। সর্বশেষ ৪৬ লাখ টাকায় করা অডিট রিপোর্ট ছিল মাত্র ৩৩ পৃষ্ঠার। সাধারণ সভায় খরচ হয়েছে ১১ কোটির বেশি, যার মধ্যে ২০২১ সালে এক সভাতেই ব্যয় ছিল ৪ কোটি ৩২ লাখ টাকা। দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, আয়ারল্যান্ড সফরে বিসিবি নিয়ম ভেঙে নিরাপত্তা খাতে ব্যয় করেছে ৬৭ হাজার পাউন্ড। সংসদ সদস্যদের নিয়ে ইংল্যান্ড সফরে খরচ হয়েছে দেড় কোটি টাকা। প্রেসিডেন্টের হেলিকপ্টার সফরে ব্যয় হয়েছে সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
তৃতীয় বিভাগে ক্লাব বাছাইয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ১৮টি নিবন্ধিত ক্লাবের মধ্যে বেশির ভাগই বেক্সিমকোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে ছিল। নথিপত্র ছিল অসম্পূর্ণ, এমনকি নির্দিষ্ট ক্লাব ভবনও ছিল না। বিপিএলের প্রথম দুই আসরে আয় ছিল ৬৬ কোটি টাকা। এরপর থেকেই দুর্নীতির ছাপ স্পষ্ট। ২০১৩-১৪ মৌসুমে আসর না করেও ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। কয়েকটি আসরে টিকিট বিক্রি ও আয়-ব্যয়ের হিসাব থেকে গায়েব হয়েছে ১১৩ কোটি টাকা।
মুজিববর্ষ উপলক্ষে কনসার্টে এ আর রহমানকে পারফর্ম করাতে খরচ হয়েছে ৫ কোটি টাকা। খাবার খরচ ৮০ লাখ এবং বাতিল হওয়া কনসার্টে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে এই খাতে ব্যয় ২৫ কোটি টাকার বেশি। ২০১৪ সালে বিসিবির টিভি স্বত্ব ৪৯ মিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য নির্ধারণ করেও তা কমিয়ে ২০.২ মিলিয়নে বিক্রি করে দেওয়া হয় এক পরিচালককে। চুক্তিতে ‘গ্যারান্টি মানি’র শর্ত না থাকায় স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পুরো প্রক্রিয়ায় ছিল ‘কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট’।
জাতীয় দল, বয়সভিত্তিক দল ও ঘরোয়া টুর্নামেন্টে যাতায়াত, খাবার, টিকিট বাবদ প্রতিটি সফরে কমপক্ষে ৩ কোটি টাকা ব্যয় হতো। বিল-ভাউচারের ক্ষেত্রেও অনিয়ম ছিল প্রকট।জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের মালিকানাধীন স্টেডিয়াম সংস্কারে বিসিবি ব্যয় করেছে ১৪১ কোটি টাকা, যেটিকে অযাচিত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বল কেনায় বিসিবির ব্যয় ১৩ বছরে ৯২ কোটি টাকা। অস্ট্রেলিয়া থেকে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষে আনা হয় ১২ কোটি টাকার বল, যেটি এখন তদন্তের আওতায়।
৮০০ কোটি টাকার স্টেডিয়াম প্রকল্পে পরামর্শক নিয়োগে হয়েছে অনিয়ম। পপুলাস নামে অস্ট্রেলিয়ান প্রতিষ্ঠানকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দেওয়া হয়েছে পরামর্শক চুক্তি। চুক্তি অনুযায়ী ফি হওয়ার কথা ২.৫ শতাংশ, কিন্তু দেওয়া হয়েছে ১০ শতাংশ হারে। মাঠে কাজ শুরুর আগেই প্রতিষ্ঠানটি তুলে নেয় চুক্তির ৬০ শতাংশ অর্থ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “বিসিবির এই আচরণ রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ববাদের প্রতিফলন। দুর্নীতির তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ অপচয় করতে না পারে।

