ভোলা জেলার দৌলতখান উপজেলা ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্যে পেশকার ও নাজির জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। দালালদের মাধ্যমে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ভুক্তভোগীরা বলছেন, জমির নামজারিসহ সেবা নিতে গেলে এই চক্রের কাছে ঘুষ না দিলে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।
দীর্ঘদিন ধরে একই কর্মস্থলে থেকে এই চক্র গড়ে তুলেছেন দুই কর্মকর্তা—নাজির মো. আনোয়ার হোসেন ও পেশকার আব্দুল খালেক। আনোয়ার ২০০৪ সাল থেকে, আর খালেক ২০১৫ সাল থেকে এই অফিসে কর্মরত। ২০২৩ সালে আনোয়ার অন্য উপজেলায় বদলি হন, কিন্তু এক বছরের মধ্যেই ফের দৌলতখানে ফিরে আসেন।
গতকাল বুধবার (২৫ জুন) সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, পেশকার খালেক এক নারী সেবাগ্রহীতার কাছ থেকে এক হাজার টাকার কয়েকটি নোট নিচ্ছেন ও তা গুনছেন। ভিডিওটি ভাইরাল হলে এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভিডিওতে যিনি টাকা দিচ্ছেন তাঁর নাম শাহনাজ। তিনি উপজেলার হাজিপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা। গত রবিবার নামজারির কাজে এসেছিলেন এবং খালেককে ঘুষ দেন।
এ ভূমি অফিসে গিয়ে দেখা গেছে, প্রতিদিন তিন-চারজন দালাল খালেকের টেবিল ঘিরে বসে থাকেন। তবে খালেক মূল অফিসে বসেন না, পাশের কক্ষে অবস্থান করেন। প্রতিবেদক সেবাগ্রহীতা সেজে খালেকের টেবিলে বসা আকবর আলীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, “খালেককে দিয়ে নামজারি করলে কোনো ঝামেলা হয় না। আমি নিজেও তার মাধ্যমে ২৫ হাজার টাকায় দুটি নামজারি করেছি। এখন আবার আরও দুটি করছি।”
আকবর আকবর আলী আরও জানান, আগে নাজির আনোয়ারের মাধ্যমেই কাজ করতেন। তবে তিনি বেশি টাকা নিতেন বলে এখন খালেকের শরণাপন্ন হন। তিনি বলেন, বিভিন্ন ইউনিয়নের একাধিক দালাল খালেকের হয়ে কাজ করেন। তাঁরা নিয়মিত অফিসে বসে থাকেন।
ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল খালেক ২০১৫ সাল থেকে, আর নাজির আনোয়ার ২০০৪ সাল থেকে দৌলতখান ভূমি অফিসে কর্মরত। দুজনের বিরুদ্ধেই ঘুষ নেওয়ার একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. রায়হান উজ্জামান জমি সংক্রান্ত একটি বিরোধের তদন্তে দৌলতখানে যান। তদন্ত শেষে চলে যাওয়ার পর নাজির আনোয়ার উপজেলা চেয়ারম্যানের পক্ষ নিয়ে বিরোধপক্ষের সদস্য ফিরোজা খাতুন ও তাঁর ছেলে আব্দুর রবকে মারধর করেন বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর জেলা প্রশাসক তাঁকে মনপুরা উপজেলায় বদলি করেন। কিছুদিন পরই তিনি বোরহানউদ্দিনে, পরে আবার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে দৌলতখানে ফিরে আসেন।
ভুক্তভোগী নুরে আলম বলেন, “দুই মাস আগে আনোয়ারকে ছয় হাজার টাকা দিয়েছিলাম নামজারির জন্য। এখন শুনি, আমার আবেদন খারিজ হয়ে গেছে। তিনি আর কোনো সহযোগিতা করছেন না।” পেশকার খালেক অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি কারো কাছ থেকে নামজারির টাকা নিই না। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।”
নাজির আনোয়ারও নিজেকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, “আমি কাউকে মারধর করিনি, শুধু কথা-কাটাকাটি হয়েছে।” তবে দৌলতখানের এসি ল্যান্ড মুন্নী ইসলাম বলেন, “পেশকার খালেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়ায় তাঁকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।” ভোলা জেলা প্রশাসক মো. আজাদ জাহান বলেন, “নাজির ও পেশকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

